পরিচর্যার অভাবে ঐতিহাসিক দিবর দীঘি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ‍্য

রেজা রায়হান | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০১:২১:২১ পিএম
পরিচর্যার অভাবে ঐতিহাসিক দিবর দীঘি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ‍্য প্রাচীন পুরাকীর্তির অনুপম নিদর্শণ স‍্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ও স‍্যার বুকানন হ‍্যামিলটনের পরিদর্শণ করা নওগাঁ জেলার ঐতিহাসিক দিবর দীঘি আর তার গ্রানাইট পাথরে তৈরী স্তম্ভটি কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আজও সগৌরবে দন্ডায়মান। তবে, যথাযথ দেখভাল ও পরিচর্যার অভাবে দিনকে দিন এই কীর্তি হারাতে বসেছে তার পুরনো জৌলুস আর দর্শকপ্রিয়তা।

নওগাঁ সদর হতে ৫৮ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে পত্নীতলা-সাপাহার আঞ্চলিক সড়কের দিবর মোড় হতে মাত্র দেড় কিলোমিটার উত্তরে দিবর গ্রামে এই ঐতিহাসিক কীর্তি অবস্থিত। সম্প্রতি ওই দিঘিতে গিয়ে জানা যায়, করোনা ভাইরাস ও লকডাউন এর কারণে সেসময় দর্শনার্থী আসেনি বললেই চলে। আর বর্তমানে আগের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম ভ্রমন পিপাসু এখানে আসেন। দীঘির দক্ষিনের পাড় ভেঙ্গে পড়ায় দর্শনার্থীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এখানে জেলা পরিষদের দুই কক্ষ বিষিষ্ট ডাকবাংলো এবং দীঘির পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে যাত্রী ছাউনি সহ ঘাট রয়েছে। নির্মিত আসনগুলো সংস্কারের অভাবে বসার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বছরে দুই ঈদে বসে ঈদ মেলা। দীঘির পাড়ে কয়েক বছর আগেও মিনি চিড়িয়াখানাতে শিয়াল, টিয়া, ঘুঘু, উটপাখি, বাঁদর, ময়না, খরগোশসহ বিভিন্ন জীবজন্তু ছিল কিন্তু এসব জীবজন্তুর রক্ষণাবেক্ষনের জন্য জনবল ও খরচের অভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যায়, না খেতে পেয়ে অনেক জীবজন্তু মারা যায় তখন। এখন খাঁচা শুন্য ওই চিড়িয়াখানা। দীঘির পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বে রয়েছে বন বিভাগের রোপিত গাছের সমারোহ। সারি সারি গাছের ঘন বনে বেষ্টিত দীঘিটির কিংবা এটি পরিদর্শনে আসা ভ্রমণপিপাসুদের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত নেই কোন নিরাপত্তা কর্মী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর মাদক সেবীদের অত্যচার বাড়ে।  
মাঝেমধ‍্যইে দীঘিতে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ ছিনতাইসহ নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনার শীকার হন। এর মধ‍্যে আবার রয়েছে বনদস‍্যুদের উপদ্রব, ইতোমধ‍্যইে বনের অনেক গাছই উধাও; গাছের কেটে ফেলা গোড়াগুলি এখনো তার সাক্ষ্য বহন করছে।

সুবিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপিত প্রাগৌতিহাসিক এই দর্শনীয় স্থানটির দেখভালের জন‍্য জেলা পরিষদ থেকে নিযুক্ত রয়েছেন একজন মাত্র কেয়ারটেকার।

কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডাকবাংলোতে ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে থাকা যায়। তিনি আরো জানান, করোনা ভাইরাস ও লকডাউনের কারণে গত এক বছর ধরে দর্শনার্থী নাই বললেই চলে, বর্তমানেও খুব কম দর্শনার্থীর আনাগোনা হয়।

দিবর দীঘির মোট জমির পরিমান ৫৫০ বিঘা কিন্তু কালের চক্রে কেবলমাত্র যথাযথ দেখভালের অভাবে ভূমিদস‍্যুদের ভোগে চলে গেছে যার বেশিরভাগটাই, বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৬০ বিঘার মতো। বিলুপ্ত জমি এলাকার ২০/২৫ জন লোকের মাঝে পত্তনি দেয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কেউ কেউ জানান।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় মহিপালের আমলে ১০৭৫ খ্রিঃ বাংলা কৈর্বত্য সম্প্রাদায়ের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং মহিপালের রাজ সভায় এই কৈর্বত্যরা উচু পদে অধিষ্টিত ছিল।

বিশিষ্ট ইতিহাস লেখক বুকারন হ্যামিলটন পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর উপর জরিপ কাজের জন্য এই অঞ্চলে আসেন। সেই সূত্র ধরে বুকারন ১৭৮৯ সালে দিবর দীঘির পাড়ে উপস্থিত হন। তিনি এই কীর্তি কৈর্বত্যদের বলে উল্লেখ করেন।

দীঘির প্রধান আর্কষন মাঝখানে নান্দনিক স্তম্ভটি। কাছে থেকে দেখার জন্য একটি নৌকা রাখা হয়েছে। গ্রানাইট পাথর দিয়ে নির্মিত অষ্টকোণবিশিষ্ট এই স্তম্ভের উচ্চতা ৩১ ফুট ১০ ইঞ্চি, পরিধি ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং ব্যাস ২৯ ইঞ্চি।

দর্শনীয় এই স্থানটি সম্পর্কে স্থানীয় দিবর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরকার জানান, বর্তমানে পিকনিক পার্টি অনেক কমে গেছে, আরো সংস্কার প্রয়োজন। উপজেলা পরিষদ হতে যে বরাদ্দ পাওয়া যায় তা একেবারে অপ্রতুল। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দিবর দীঘি উত্তরবঙ্গের মধ্যে অন্যতম পর্যটন খাত হিসাবে গড়ে উঠতে পারে।

এ প্রসঙ্গে পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিটন সরকার জানান, দীঘির সংস্কারের জন্য জেলা পরিষদ হতে ৪০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, এতে দীঘির পাড় ভাঙ্গন রোধে গাইড ওয়াল নির্মান, রাস্তা হিয়ারিং সহ বেশকিছু উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হবে।
 
পত্নীতলা (নওগাঁ) প্রতিনিধি/এনএ/দৈনিক বাংলাপত্রিকা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন