খাগড়াছড়ির মাশরুম চাষে নারীর সফলতার গল্প

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি | সারাদেশ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১ | ০৮:২২:২৮ পিএম
খাগড়াছড়ির মাশরুম চাষে নারীর সফলতার গল্প
খাগড়াছড়ি জেলা সদরে ঠাকুরছড়া এলাকার বাসিন্দা নিপু ত্রিপুরা নিজ উদ্যোগে ও কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে মাশরুম চাষ, বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি খাগড়াছড়িতে প্রথম মাশরুম বীজ উৎপাদনকারী খামার তৈরি চ্যালেঞ্জা গ্রহণ করেছেন, সম্পূর্ণ নিজের পরিশ্রম ও কঠোর ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে। তিনি মাশরুম চাষ, বীজ উৎপাদনের জন্য অতীতে নানান ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন।

মাশরুম চাষে  নারী উদ্যোক্তা নিপু ত্রিপুরার চ্যালেঞ্জ গ্রহণের গল্প:
খাগড়াছড়ি সদর ঠাকুরছড়ার বাসিন্দা মাশরুম চাষে নারী উদ্যোক্তা ও মাশরুম বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নিপু ত্রিপুরা। তিনি যেভাবে মাশরুম চাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন, তাঁর পেছনের গল্প, বর্তমানে কেমন চলছে তার গল্প... বিগত ২০২০সালে করোনা চলাকালীন সময়ে কঠোর লকডাউন চলছিল। অনেকের ঘরে চাল, ডাল ছিল না। তারও প্রচুর অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হতো।

তাঁর মুখ থেকে গল্প শুনি..
আমি ভাবলাম গৃহিণী হয়ে না থেকে একজন নারী উদ্যোক্তা হয়ে নিজের সংসারের উন্নতি ও এলাকায় বসবাসরত গরীব মানুষের কর্মসংস্থান করবো। দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখি, নিজে কিছু একটা করে স্বাবলম্বী হবো, নিজে স্বাবলম্বী হয়ে, অন্যকে ও স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবো। আমি কোন এনজিও কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ পাই নি। যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখি করোনার মহামারীর জন্য প্রশিক্ষণ বন্ধ রয়েছে। এরপর উলবাবু মাশরুম স্বত্বাধিকারী ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক সুদর্শন মামা কে নিজ বাড়িতে আমার কর্মচারীদের নিয়ে ব্যক্তিগত খরচে প্রশিক্ষণ নিই। তখন আমি সুদর্শন মামার কাছ থেকে মাশরুমের বীজ ক্রয় করতাম। মাশরুমের বীজ ৫০০টি চাইলে তিনি আমাকে ২০০এর মত বীজ দিতে পারতেন, প্রায় সময় তিনি দিতে পারতেন না। শীতকালে মাশরুমের ফলন অনেক ভালো হয়, পানি দিতে হয় দুইবার, সকালে একবার বিকালে একবার। সেজন্য অনেকেই শীতকালে বেশি করে মাশরুম চাষ করে থাকে।

তখন অনেকে অলস সময়কে কাজে লাগানোর জন্য মাশরুম চাষ করে থাকে। এজন্য সুদর্শন মামা মাশরুমের বীজ কাকে রেখে কাকে দিবেন এই নিয়ে দ্বিধায় থাকতেন।আমি যেহেতু ধারকর্জ করে পুঁজি করেছি, তাই সবসময় আমার ২০০০ মাশরুমের খড়ের প্যাকেট করার টার্গেট ছিল। সুদর্শন মামার নিকট থেকে প্রয়োজন মাফিক মাশরুমের বীজ না পাওয়ার ফলে রাঙ্গামামাটি থেকে শ্যামল বাবুর নিকট এবং ঢাকা সাভারের পাপিয়ার কাছ থেকে মাশরুমের বীজ কিনতাম। তাদের নিজেদের বাসা থেকে কুরিয়ার সার্ভিস স্টেশন পর্যন্ত ভাড়া, ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি কুরিয়ার খরচ, কুরিয়ার সার্ভিস থেকে আমার বাসা পর্যন্ত ভাড়া এবং নানান যাবতীয় খরচ আমাকেই বহন করতে হতো। তারপর আমার কর্মচারীদের দিন শেষে দৈনিক মজুরি দেওয়া, খড় কেনা, খড়ের মাশরুম প্যাকেট ঝুলানোর ব্যবস্থা করা, ঘর বানানো সহ এইসমস্ত মিলে ধারদেনা, কর্জ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন ভাবলাম আমার যা আয় হয়, সবই তো অন্যের পকেটে যাচ্ছে। আমার তো লাভ হচ্ছে না। আমি নিজেই মাশরুমের বীজ উৎপাদন করতে পারলে মাশরুমের বীজ বিক্রি করে লাভ করতে পারবো, তখন লাভ ও আসবে আবার সঠিক সময়ে খড়ের প্যাকেট ও করতে পারবো। পাশাপাশি কর্মচারীদের ও স্থায়ীভাবে রাখতে পারবো। তখন আমি জানুয়ারী মাসে চলে যাই ড্রীম মাশরুম সেন্টার, মাগুরায় বাবুল আক্তারের নিকটে। সেখানে নিজ খরচে ৩(তিন)দিনের প্রশিক্ষণ (ট্রেনিং) নিয়ে আসি, তারপর আবার খাগড়াছড়িতে উলবাবু(সুদর্শন মামা)'র নিকটে এবং তার ছোটভাই সুমন মামার নিকট থেকে ২(দুই)দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেছিলাম বীজ উৎপাদন। নতুন নতুন অনেক বীজ নষ্ট হয়েছিলো। এরপর ধীরে ধীরে বীজ নষ্ট হওয়া কমে আসছিলো। বর্তমানে অনেক ভালো বীজ উৎপাদন হচ্ছে। এখন আমি অনেক খুশি এবং আমার কর্মচারীরাও খুশি। তারাও এখন আমার খামারে কাজ করে কিছুটা হলেও পরিবারের অভাব পূরণ করতে পারছে। এখন আমার মাশরুম খামারে প্রতি মৌসুমে অর্থাৎ প্রতি প্রতি দিন ৩-৪কেজি মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে। মাসে প্রায় ১১০-১২০কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি দুই মাসে ২২০ থেকে ২৪০ কেজি পর্যন্ত মাশরুম উৎপাদন হয়ে থাকে। শীত কালে প্রতি কেজি মাশরুম বিক্রি হয় ২২০-২৪০ টাকা ধরে, আর গরম কালে কেজি প্রতি বিক্রি হয় ৩৫০-৪০০ ধরে।

এতে করে বর্ষার মৌসুমে আয় হয় ৮৪-৯০ হাজারের মত। বছরে ৪-৫ লক্ষ টাকার মতো আয় হয়। আমাকে দেখে এখন অনেকে মাশরুম চাষে আগ্রহী হচ্ছে। আমার থেকে অনেকেই বীজ কিনে নিয়ে যাচ্ছে, যারা বীজ নিয়ে গেছে, তারা আমার মাশরুম বীজ নিয়ে অনেক সুফল পাচ্ছে।

নিপু মাশরুম খামারে প্রায় ৪ ধরনের মাশরুম উৎপাদন হয়। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে পিও-২, পিও-১০, (সাদা জাতের) মাশরুম এবং পিএসসি (ছাই রঙের) এবং ঋষি মাশরুম চাষ করা হচ্ছে। সামান্য ঠান্ডা  জায়গাতেও মাশরুম চাষ করা যায়। খড়ের বেডে মাশরুম চাষ সাধারণত ৩ ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফসল উৎপাদনের জন্য চাষ ঘরে ২১ দিন থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই মাশরুম পাওয়া যায়। মাশরুম চাষ একটি লাভজনক চাষ। যত্ন নিলে সারা বছর কমবেশি ফলন পাওয়া যায়। তবে বীজের অভাবে অনেকেই মাশরুম চাষ করতে পারছে না। অধিকাংশ মানুষ বাইরে থেকে বীজ সংগ্রহ করে মাশরুম চাষ করছে। এখন মাশরুম চাষে  আগ্রহীরা তার নিকটে থেকে বীজ পাবেন বলে জানান। তিনি শুধু মাশরুম চাষ নয় বাড়ি পাশে একটি মুদি দোকানও চালান তিনি। এছাড়া স্থানীয় ৫ জন নারীকে বেতন দিয়ে অস্থায়ীভাবে যুক্ত  করেছেন মাশরুম চাষে।

সেখানে কর্মরত বিনতা ত্রিপুরা ও আপন বালা ত্রিপুরা বলেন, বাইরে প্রতিদিন কাজ পেতাম না। অধিকাংশ সময় কাজ ছাড়া থাকতে হতো। অনেক সময় আমার পরিবার এবং আমাকে উপোস ও থাকতে হতো। কিন্তু এখানে পুরো মাসজুড়ে মাশরুম চাষে সময় দিচ্ছি। এতে যা পাই তা দিয়ে মোটামুটি সংসার চলছে। আমরা এখানে কাজ করতে পেরে অনেক খুশি এবং সুখে আছি। নিপু ত্রিপুরাকে দেখে অনেকে মাশরুম চাষে আগ্রহী হচ্ছে। তাদের অনেকে উৎপাদিত মাশরুম যাচ্ছে বাজারে।

মাশরুম চাষে উদ্যোক্তা নিপু ত্রিপুরা প্রতিবেদক কে জানান : মাশরুম চাষে সরকারিভাবে একটি স্থায়ী প্রকল্পের সুবিধা বা সহযোগিতা পেলে এবং একটি মাশরুম বিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ সেন্টার পেলে, এখানে অনেক বিধবা নারী, অস্বচ্ছল ও গরীব মানুষের কর্ম মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারবো। আর্থিক ভাবে তারা স্বাবলম্বী হতে পারবে। তিনি একটি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য আবেদন জানান।

এবিষয়ে খাগড়াছড়ি কৃষি অধিদপ্তর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক কিশোর কুমার মজুমদার প্রতিবেদককে বলেন, পাহাড়ের পাহাড়ী নারীরা সমতলের নারীদের চেয়ে অধিক পরিশ্রমী ও কঠোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এটি পাহাড়বাসীর জন্য অত্যন্ত খুশির ভবিষ্যৎ। স্বচ্ছ সবজি হিসেবে মানুষের মাঝে মাশরুম এখন বেশ জনপ্রিয়। বর্তমান বাজারে মাশরুমের চাহিদা অনেক বেশি। বাংলাদেশের অনেক মাশরুম চাষীদের মত ঠাকুরছড়ার বাসিন্দা নিপু ত্রিপুরা মাশরুম চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। সেখানে অন্য নারীরাও কাজ করছে। এটি অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হবে। তার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে। সরকারি ভাবে প্রশিক্ষণের জন্য ও তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আমরা সবসময় নিপু ত্রিপুরার পাশে আছি, পাশে থাকবো। সময় করে নিপু মাছরুম ঘর টি পরিদর্শনে যাবেন বলে ও জানান।

মাশরুম চাষে সফল উদ্যোক্তা নিপু ত্রিপুরার পরিচয়:

মাশরুম চাষে নারী উদ্যোক্তা নিপু ত্রিপুরার জন্ম রাঙ্গামাটি গর্জনতলী গ্রামে। তিনি সুকুমার ত্রিপুরা ও নিলা ত্রিপুরা ৫কন্যা সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় কন্যা।

তিনি প্রাইমারীতে হাতে খড়ি লাভ করেছেন কাঠাঁলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর মাধ্যমি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।তাপর নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন সাপছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন। তিনি রাঙ্গামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের নিয়মিত নৃত্যশিল্পী হিসেবে ছিলেন। তিনি ৫ই মে ২০০৪খ্রিস্টাব্দে খাগড়াছড়ি জেলা সদর ঠাকুরছড়ার বাসিন্দা যশু ত্রিপুরার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমান তার দুই কন্যা সন্তান নিয়ে সংসার করছেন। স্বামী যশু ত্রিপুরা পূবালী ব্যাংক খাগড়াছড়ি শাখায় দারোয়ান হিসেবে কর্মরত আছেন।

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক/এসএ/বাংলাপত্রিকা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন