স্বাধীনতার গল্প `সুনয়না'

রাজিব আহম্মেদ | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শনিবার, ১৫ মে ২০২১ | ১০:১৯:৪৭ এএম
স্বাধীনতার গল্প `সুনয়না' মে মাস ১৯৭১। গ্রাম ধীরে ধীরে জনশূণ্য হয়ে যাচ্ছে। কালকেও বাড়ির ছোট ছেলেটা চট করে নিখোঁজ।

তার দুদিন আগে দাসবাবুর চাকর।বসে বসে ভাবে নিলু তার হাতে গতকাল সকালে যে চিঠিটা এসেছে সেইটা মিথ্যা হয়ে গেলেই পারতো! বুকের ভিতর পাথর নিয়ে একমনে তাকিয়ে আছে রাস্তার পাশের পলাশ ডালে। শরীর জুড়ে ক্ষত বিক্ষত করে দেবার মত সূচালো কাঁটা অথচ তার ডালভর্তি কেমন রক্তিম মায়া।

-নিলু
পেছন থেকে ডাকলেন আশরাফ সাহেব।নিলু চোখ মুখ মুছে পিছনে তাকালেন।আতঙ্ক ভরা চোখে তাকিয়ে আছেন আশরাফ সাহেব।
-কী হয়েছে বাবা?
জিগ্যেস করলো নিলু।
-শহিদুল্লা নাকি মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিছে?
-বাবা আমি বলতে পারবো না।আমাকে বলে যায়নি।
-আচ্ছা।তুমি একটা কাজ করো,তুমি জামানের কাছে খবর পাঠাও।ওরে বাড়ি আসতে কও।এহন জামান তোমার পাশে থাকলে তুমি সাহস পাইবা।আর শহরে এমনিতেও ঝামেলা হচ্ছে,রেডিওতে শুনলাম।যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে নানান জায়গায়।
-ঠিক আছে বাবা।আমি চেষ্টা করছি।আপনার জন্য খাবার দিয়েছি।খেয়ে নিন।আমি নামাজ আদায় করবো।
-আচ্ছা মা।তুমিও নামাজ শেষে খেয়ে নিও।আমি খেয়ে শহিদুল্লার খোঁজে বের হবো।ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে!

নিলু নামাজ শেষ করার পর মোনাজাতে কেঁদেই যাচ্ছে।সেই কান্নার কথা একামাত্র সৃষ্টিকর্তা ব্যতিত আর কেউ জানতে পারবে না।পেটের ভেতর আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে অনাগত সুখ।সেই সুখের জন্যই তার বুকের ভেতর হু-হু করে দীর্ঘশ্বাস জমছে।

১৮ ই মে,১৯৭১
চারপাশ অন্ধকার হয়ে আছে।মনে হচ্ছে কালো আবরণে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পৃথিবীকে।চারপাশ নিরব, প্রকৃতিকেও বোধ হয় বলা হয়েছে, “চুপ।একদম চুপ!কোনো আওয়াজ করবি না।”
জানলার পাশে বসে আনমনে ভাবছিলো নিলু এইসব।তার ভাবনার সুতো ছিড়লো উঠোনের হওয়া পায়ের শব্দে।
নিলুর ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো,হঠাৎ তার প্রচুর তৃষ্ণা পেলো।

দরজার কাছ থেকে ফিসফিসয়ে আওয়াজ এলো, `ভাবী, আমি শহিদুল্লা। দরজা খুলো।'

নিলুর চোখমুখ আনন্দে জ্বল জ্বল করে উঠলো। সে দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
-ভাবী, এরা আমার সহযোদ্ধা।ট্রেনিং শেষ করে ফিরলাম আজ। খুব খিদে লাগছে। খাইতে দাও।
-হাত মুখ ধুয়ে আয়।

২৭ই মে, ১৯৭১
মাগরিবের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হতেই দাসবাবু আশরাফ সাহেবকে ডাকলেন। দাসবাবু তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
দাসবাবু চাপা কন্ঠে বললেন-
-চলুন আমার সাথে। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
-কোথায় যাবো?
-আসুন আমার পেছন পেছন।
দাসবাবু এবং আশরাফ সাহেব এসে থামলেন রাস্তার পাশের নির্জন মাঠের কাছে।
আশরাফ সাহেব জিগ্যেস করলেন-
-ব্যাপারটা কী বলুন তো?
-ব্যাপার আর কি! আপনার ছোট ছেলেকে নাকি মুক্তি বাহিনীতে যোগ করিয়েছেন।
-আমি এ ব্যপারে কিছুই জানি না, দাসবাবু।
-জানেন না! পেটের ভুঁড়ি গালিয়ে দিলে তখন ঠিকই জানবেন। বড় ছেলেকে দূরে রেখে ছোট ছেলেকে দিয়ে বৌ এর সাথে নষ্টি-ফষ্টি করান, সে সব আমরা জানি না! সময় এবং সুযোগ দু’টোই আছে। আমাদের দলে ভিড়েন।
-কী বলছেন আপনি এইসব!
-যা বলছি আপনার ভালোর জন্য বলছি। শিক্ষিত মানুষ আপনি। আপনি এসব বুঝবেন ভালো। যাইহোক, বিদায় হোন।

আশরাফ সাহেব একবার ভালো করে দেখে নিলেন দাসবাবুকে। তার পরনে আলখেল্লা, মুখে দারি,কপালে কালো গাঢ় দাগ! চোখজুড়ে বিন্ময় আর কপাল জুড়ে চিন্তার ডোড়াকাটা ভাজ নিয়ে এক ভাবনার জগৎতে ডুব দিলেন।

*৩ জুন, ১৯৭১
গ্রামের স্কুলে এসে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে মিলিটারির দল।সেখানে সারাক্ষণ দেখা যায় দাশবাবুকে ওরফে দাউদ খান’কে! পোশাকের সাথে সাথে নামও বদলে ফেলেছে সে।

সন্ধ্যার মধ্যেই ৬ গাড়ি ভর্তি মিলিটারি এসে পৌঁছেছে।রাতে আরও আসবে শোনা যাচ্ছে।এরই মধ্যে গ্রাম থেকে হাঁস-মুরগি, ফল-সবজি হারানো শুরু হয়েছে। সাথে গ্রামের সুন্দরী মেয়েদের উপরও একবার নজর বুলিয়ে নিয়েছে দাউদ খান।

রাত আটটায় আরও ২ টা গাড়ি এসে পৌঁছালো। এরপর এক গোপন বৈঠকের আলোচনা করা হলো।সেখানে মূলত দাউদ খানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হলো।

*৫ জুন,১৯৭১
স্কুলের পাশের পুকুরে ভাসতে দেখা যায় আশরাফ সাহেবের লাশ,কানাই মোল্লার লাশ সহ তার স্ত্রীর নগ্ন মরাদেহ।
বিকেলে একদল মুক্তিবাহিনী গ্রামে ঢুকলো।তারা অবস্থান নিয়েছে কানাই মোল্লার বাড়িতে।শহিদুল্লা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। শহিদুল্লা সহ বাকিরা সন্ধ্যায় চলে গেলো নিলুর কাছে। নিলু পুঁইশাকের ঝোল আর ভাত নিয়ে বারান্ধায় অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

শহিদুল্লাকে দেখে নিলুর খুব চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কান্না আটকালো। হঠাৎ শহিদুল্লা বলে উঠলো-

*ভাবী, আমাদের আর কেউ রইলো না।
*চুপ! কেউ টের পেলে ঝামেলা আছে।
*খাওয়া দাওয়া শেষ করো। তারপর কথা আছে।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে নিলুর দিকে।নিলু হঠাৎ কেমন আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠেছে। চোখে মুখে তার রক্তের নেশা।

নিলু বলতে শুরু করলো-
আমি কাল বিকেলে যাবো স্কুলের মাঠে।এরপর ওরা সবাই যখন আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠবে তখন তোমরা ঝাঁপিয়ে পরবে জানোয়ারদের উপর।আজকে রাতের মধ্যে আরও লোকজন আনাও, অস্ত্রও আনাও। তোমরা তোমাদের স্থান, কাজ ভাগ করে নাও। তবে সাবধান ওরা কোনো ভাবে বুঝতে পারলে তোমাদের রেহাই নেই।সাথে আমারও।

*৬ই জুন ১৯৭১, বিকেল ৪.১৮ মিনিট
নিলু দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের মাঠে।সাথে বোরকা পরা আরও তিনজন। দাউদ খানের নিলুর দিকে চোখ পরতেই খুশিতে আত্নহারা হয়ে। এসে শক্ত করে নিলুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো স্কুলের ভেতর।সাথের বোরকা পরিহিতাদেরও নেয়া হয়েছে।

স্কুলের পেছন দিক থেকে একদল যুবক ঘিরে ফেলেছে স্কুলের চারপাশ।যুদ্ধের দামামায় ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ।সন্ধ্যা নামতে নামতে সবকিছু থেমে গেলো।সূর্যের রক্তির আভা আরও বেশি রক্তিম করে তুললো স্কুলঘর।স্কুল ঘরের দেয়াল জুড়ে লেগে আছে লাল রঙা আবীর, মাত্রই শেষ হলো হলি খেলা। শুকিয়ে যাবার আগেই টপটপ করে পরছে দেয়াল থেকে। স্কুল ঘরের মেঝে গড়িয়ে রক্তের স্রোত বেরিয়ে আসছে মাঠের দিকে।রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ।

এরমাঝে বিদগ্ধ,অর্ধ নগ্ন শরীরের পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী এবং দুঃখী মানুষ দেখা যাচ্ছে-নিলু। শহিদুল্লার বুক ভারী হয়ে আসলো, সে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না।নিলুর কাছে গিয়ে হঠাৎ করে খেয়াল করলো, একটি সাদা কাগজ।শহিদুল্লা নিলুর মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে কাগজ বের করে পড়তে লাগলো।

নিলু,
গতকাল ঢাকায় মুক্তিবাহিনী আক্রমন করেছে।সেখানে প্রায় সবাই শহীদ হয়েছে।তাদের মধ্যে জামানও ছিলো।
জামানের ইচ্ছে তার অনাগত মেয়ের নাম রাখবে “সুনয়না”। তারজন্য জামান কয়েটা জামা কিনেছে।আমি বাড়ি আসার সময় নিয়ে আসবো।নিজের যত্ন নিয়ো।সুনয়নার খেয়াল করো,সাবধানে থেকো।আর যেকোনো প্রয়োজনে চিঠি লিখো।

ইতি,
তোমার বজলু ভাই

চিঠির পিছনের পৃষ্টায় লেখা।
” শহিদুল্লা,তুমি যখন চিঠিটা পড়ছো তখন আমি,আব্বা,তোমার ভাই আর তোমার ভাই আর আমার অনাগত সুখ-“সুনয়না” বেহেস্তে হাসাহাসি করছি।আর তুমি নিজেকে নিঃস্ব,একা মনে করছো।কিন্তু তুমি একা না।যাদের জন্য তোমার আজ কেউ নেই।তাদের বাঁচতে দিও না।তোমার ভাইকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলো না,তাই…..
আর তোমার যদি মেয়ে হয়,তার নাম রেখো-“সুনয়না”।


খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন