ভাঙ্গা চশমা

মোঃ বশির আহমেদ | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ০৫:৫১:৫৬ পিএম
ভাঙ্গা চশমা
বৃদ্ধ মায়ের ভাঙ্গা চশমাটা আর ঠিক হলো না!
শাশুড়িঃ- বউমা কোথায় তুমি, একটু এইদিকে আসবা?
বউঃ- কি হইছে, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই এতো চেঁচামিচি শুরু করতেছেন কেন?
শাশুড়িঃ- বউমা ক্ষুধা লাগছে কিছু দিবা? বউঃ- আপনার টেবিলে না মুড়ি আছে, মুড়ি খান।  
শাশুড়িঃ- আজ একসাথে দুইটা দাঁত খুব ব্যথা করতেছে, মুখে মুড়ি নাড়তে কষ্ট হয়। বাসায় অন্যকিছু থাকলে দাও।  
বউঃ- পানি আছে তো নাকি? মুড়ি পানিতে ভিজিয়ে খান।

শাশুড়িঃ কি ঠান্ডা পড়তেছে দেখেছো? ঠান্ডা পানি দিয়ে মুড়ি খাবো কিভাবে বল?
বউঃ- ঘরে আর কিছুই নাই। মুড়ি খাইতে পারলে খান, না হয় চুপ থাকেন। কিছুক্ষণ পর রান্না হয়ে যাবে, রান্না হলে ভাত খাইয়েন।
শাশুড়িঃ বউমা একটু চিনি দাও, মুড়ি পানিতে ভিজিয়েছি, চিনি ছাড়া কি মুড়ি খাওয়া যায় বল? কেমন পানসে পানসে লাগে! একদম বিস্বাদ!
বউঃ- কি সুন্দর কইরা কয় বিস্বাদ! এতো শুদ্ধ কওনের কি আছে? আর শুনেন, চারদিন ঘরে চিনি নাই। টাকা শেষ হয়ে গেছে, এই জন্য চিনি আনতে পারছি না। শাশুড়িঃ- আচ্ছা বউমা, না থাকলে আর কি করবা। ঠিক আছে আমি চিনি ছাড়াই খেতে পারবো, তুমি তারাতারি রান্না কর। গতকাল তোমার রান্নাবান্না করতে করতে অনেক লেট হয়ে গেছে যার কারণে আমার নাতি না খেয়ে স্কুলে গেছে।
বউঃ- কি দরদ দেখাচ্ছে! মনে হয় আমার সন্তানের জন্য আমার চেয়ে তার দরদ বেশি! যতসব ঢং! এই আপনে চুপ থাকেন তো, একটু রান্না করতে দেন। আপনার সাথে বকবক করুম, না রান্না করুম। উপ কি বিরক্ত!

শাশুড়িঃ- ঠিকই তো, আমি তোমাকে খুব বিরক্ত করতেছি। আর কিছুই কমু না মা, তুমি রান্না কর। . দুপুরবেলা বউমার মোবাইলে কল আসে। তখন বউমা ঘরে ছিল না। বৃদ্ধ মা চশমাটা চোখে দিয়ে মোবাইলে আসা কল রিসিভ করল।

ছেলেঃ-  হ্যালো.... _মা কেমন আছো তুমি? মাঃ- হ্যাঁ বাবা খুব ভালো। তুমি কেমন আছো?
ছেলেঃ- মা আমিও খুব ভালো। আর শুনো আগামী মাসের এক তারিখ নতুন একটা ব্যবসা করতে যাচ্ছি, তুমি দোয়া কইরো। মাঃ- হ্যাঁ বাবা, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করবেন। ঠিক মত চলাফেরা করবা। আর পারলে বউমাকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিও। ঘরে চিনি নাই, নাতি তো অনেক মিষ্টির পাগল। আজ চারদিন নাকি চিনি শেষ হয়ে গেছে।

ছেলেঃ- মা গত মাসে আঠারো হাজার টাকা দিয়েছি। বাড়িতে তিনজন মানুষ এই টাকা দিয়েও হয় না? ঠিক আছে সামনের মাসে দুই হাজার টাকা বাড়িয়ে দিবো। আর শুনো, তোমার বউমা কোথায়?
মাঃ- বউমা সারাদিন কাজ করে কিছুক্ষণ আগে গোসল করতে গেছে।
ছেলেঃ- আপনার কোনো সমস্যা হয় নাতো মা?
মাঃ- না বাবা, আমি ভালই আছি। বাবা তুমি খাবার ঠিক মত খাও তো?
ছেলেঃ-  হ্যাঁ মা ঠিক মত খাই। আচ্ছা শুনো ডিউটির সময় হয়ে যাচ্ছে আমি গেলাম। . কিছুদিন পর বৃদ্ধ মায়ের চশমাটা ভেঙ্গে যায়। চশমার জন্য কোরআন শরীফ পড়তে পারছেন না। বউমাকে দুইদিন চশমার কথা বলেছে, বউমা হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। আজ তৃতীয় দিন আবার একই কথা,,, শাশুড়িঃ- বউমা আজ দুইদিন কোরআন শরিফ পড়তে পারছি না। চশমাটা যদি ঠিক করে দিতে?

বউঃ- আপনার ছেলে আজকে মাত্র টাকা পাঠাইছে। ব্যাংক থেকে টাকা না উঠালে কিভাবে চশমা ঠিক করবো?
শাশুড়িঃ- আচ্ছা আজকে তো ব্যাংকে যাবে, আমার চশমাটা নিয়ে যেও, একটু ঠিক করে আনলে আমি কোরআন শরীফ পড়তে পারবো।
বউঃ- দেন। (রাগ মুডে) . কিছুক্ষণ পর বউমা বাজারে যায় এবং ব্যাংক থেকে বিশ হাজার টাকা তুলে মাসিক বাজার করে বাসায় চলে আসে। চশমাটা আর ঠিক করতে মনে ছিল না। . এই দিকে বউমার বড় ভাই কবির সাহেবের কিছু টাকা প্রয়োজন। টাকার জন্য বোনকে কল দিলে তিনি বিকাশ করে সাথে সাথে টাকা পাঠিয়ে দেয়। বউমা বাসায় গিয়ে বাজার থেকে নেওয়া সবকিছু গোছালেন। শাশুড়ি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে হাসি মুখে বউমার কাছে চশমাটা চাইলেন। শাশুড়িঃ- বউমা কখন আসছো বাজার থেকে?

বউঃ- এক ঘন্টা হয়ে গেছে।
শাশুড়িঃ- মা চশমাটা দাও, যোহরের নামাজ পড়ে কোরআন শরীফ পড়বো। আজ দুইদিন কোরআন শরীফ পড়তে পারি না। বউঃ- আম্মা চশমাটা ঠিক করতে মনে ছিল না।
শাশুড়িঃ- কি কও মা!
বউঃ- সত্যি মনে ছিল না।
শাশুড়িঃ- আচ্ছা মনে না থাকলে আর কি করবা? ঠিক আছে কালকে নিয়া ঠিক করে দিও।
বউঃ- আম্মা টাকা তো সব শেষ। দুই হাজার টাকা আছে ঐ টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ এবং গ্যাস বিল দিতে হবে। আর বড় ভাই একটা সমস্যায় পরে গেছে ভাইকে কিছু টাকা ধার দিছি। বড় ভাই টাকা দিলে আপনার চশমা ঠিক করে দিবো।

শাশুড়িঃ- তোমার ভাই কখন টাকা দেয় না দেয় ঠিক আছে কি! পারলে কারও কাছ থেকে দুই তিনশত টাকা ধার নিয়ে আগামীকাল চশমাটা ঠিক করে দিও।
বউঃ- এতো তাড়াহুড়ো করার কী আছে? সামনের মাসে না হয় নতুন একটা কিনে দিবো।

শাশুড়িঃ- তুমি বুঝবা কী? তোমার যা ইচ্ছে তাই কর। আমি কিছুই বলবো না। . মনে কষ্ট নিয়ে কিছু না বলেই চলে গেলেন। যাওয়ার সময় ছোট্ট করে 'আল্লাহ্' শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন। এই শব্দটার অর্থ বউমার বোঝার ক্ষমতা হয়নি। . রাতে কল আসে বাবার বাড়ি থেকে। বউমার ছোট বোনকে দেখতে এক ছেলে পক্ষ্য আসবে। সেখানে তার থাকা টা জরুরী। মা এবং ছোট বোনের রিকুয়েস্টে পরদিন বউমা তার বাবার বাড়ি যায়। সাথে শাশুড়ি আর ছোট্ট ছেলে মিয়াদ। যাওয়ার পথে দুর্ভাগ্যক্রমে বাস অ্যাকসিডেন্ট হয়ে সবাই আহত হয়। বৃদ্ধ মা আর মিয়াদের তেমন কিছুই হয়নি। কিন্তু বউমার চোখে গ্লাস ভাঙ্গা গিয়ে জীবনের তরে অন্ধ হয়ে যায়! . এখন বউমা অবশ্য চশমা পরে। খুব বড় মাপের চশমা। কিন্তু চোখে দেখার যোগ্যতা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। . ভাগ্য মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় তা আল্লাহ জানেন। যে মানুষটা বৃদ্ধ শাশুড়ির ভাঙ্গা চশমা ঠিক করে দিতে চায়নি। আজ সে মোটা কালো চশমা চোখে দিয়ে হাঁটে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করেন আমিন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন