‘ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন বাস্তব সম্মত আইন ও বিচার নিশ্চিত করণ’

মোঃ আরাফাত রহমান | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২০ | ১০:১৪:২৮ পিএম
‘ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন বাস্তব সম্মত আইন ও বিচার নিশ্চিত করণ’
ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল দেশ। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে মানব বন্ধন। যার যার অবস্থান থেকে যে যেভাবে পারছে সেভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কেউ রাজপথে নামছেন, আবার কেউ শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রতিবাদী অবস্থান ব্যক্ত করছেন।

বলতে গেলে সারা দেশ এখন একটা হুজুগের মধ্যে আছে। সবাই চোখ বন্ধ করে ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসির দাবি চাচ্ছেন। কেউ আগে পেছনে কিছুই ভাবছেন না। কমিউনিস্ট ভাবধারার ব্যক্তি থেকে শুরু করে মুক্তমনা নাগরিকরাও ধর্ষকের শাস্তি ফাঁসি দেয়ার দাবি তুলছেন। কিন্তু ফাঁসির আইন করলেই কি এদেশে ধর্ষণ থেমে যাবে? আমাদের দেশে ধর্ষণের হার বৃদ্ধির কারণ আসলে কি?

আজ থেকে ১৪শ বছর আগেই ধর্ষকের শাস্তি হিসেবে ফাঁসির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আমাদের তথাকথিত বাম ও আধুনিক সমাজ এই ধর্মীয় আইনটিকে বর্বর ও পৈশাচিক বলে আখ্যা দিয়ে আসছিল। কিন্তু আজ ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসির দাবিতে তারাই রাজপথে বেশী সোচ্চার। অপরাধ হিসেবে ধর্ষণ কতটুকু গুরুতর এবং এর শাস্তি কি হওয়া উচিত এটি অবশ্যই সুক্ষভাবে বিবেচনা করা উচিত। শাস্তি হতে হবে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে। অপরাধ যতটুকু গুরুতর হবে শাস্তিও ঠিক সেই মাত্রা বুঝেই নির্ধারণ করা উচিত।

আমি কোনভাবেই ধর্ষকের শাস্তির বিপক্ষে অবস্থান করছি না। ধর্ষণ একটি জঘণ্য, ঘৃণিত ও ভয়াবহ অপরাধ। এমন অপরাধের যথাযোগ্য শাস্তি অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু তা হতে হবে আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। এদেশে আইন অপ-প্রয়োগের হার বিশ্বের অন্যান্য যে কোন দেশের চাইতে বেশী। সর্বসাকুল্যে আমরা যদি হাতে কলমে হিসেব করতে চাই , তবে দেখতে পাবো যে ৯০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে অধিক ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ হয়। নির্দোষ মানুষ শাস্তি পায় ,আর প্রকৃত অপরাধী ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে রায়। যে সকল দেশে আইনের শাসন অত্যন্ত দুর্বল, সেই সব দেশগুলোতে মৃত্যু দন্ডের মতো এতো কঠোর একটি আইন প্রণোয়নের আগে অবশ্যই তার বাস্তব ভিত্তিক পর্যালোচনা করে নেয়া উচিত। কারণ এতে করে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নির্দোষ মানুষ হয়নানির শিকার হতে পারে। বিশেষ করে ধর্ষণের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এর অপপ্রয়োগের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্ককেই একটি পর্যায়ে এসে ধর্ষণ হিসেবে অভিযোগ কিংবা প্রচার করা হয়। বিশেষ করে হাই প্রোফাইলের কোন ব্যক্তিকে ঘায়েল করার ক্ষেত্রে 'নারী' একটি বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র। আদিম কাল থেকেই এই সহজলভ্য অস্ত্রটিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার বহু নজীর ইতিহাসে রয়েছে। সাম্প্রতিক কালে এর সবচেয়ে বড় উদাহারণ হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিপি নুরুল হক নুরু। নুরু নিজে ধর্ষক না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রতিটি মিডিয়া 'ধর্ষক নুরু' শিরোনামে সংবাদ প্রচার করেছে। কেবল মাত্র রাজনৈতিক ভাবে তাকে ঘায়েল করার জন্যই এমন মিথ্যা একটি অপবাদ দেয়া হয়েছিল। একজন পুরুষ ধর্ষক না হয়েও তাকে ধর্ষক অপবাদ দেয়ার মতো জঘণ্য কাজ আর কি হতে পারে? তাছাড়া নারী নিজেও ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্রে ধর্ষণ নামক এই ভয়াবহ বিষ পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে কঠোর আইন করার চেয়ে বিদ্যমান আইনেই বিচার নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে বেশী জরুরী। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই যেমন: মাদক ,হত্যা ইত্যাদি  বিষয়ে কঠোর আইন রয়েছে। সরকারের এগুলোতে জিরো টলারেন্স নীতিমালা থাকলেও বাস্তবিকভাবে এগুলোর মতো গুরুতর অপরাধের বিচার কতটুকু নিশ্চিত হয়? হত্যার বিপরীতে ফাঁসির আইন আমাদের দেশে বহুকাল আগে থেকেই আছে। তারপরও আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০টি খুন বা হত্যার ঘটনা ঘটে। এর মূল কারণ হচ্ছে অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসক দলের ছত্রছায়ায় অথবা ঘুষ খেয়ে পুলিশ অপরাধীদের ছেড়ে দেয়, অথবা আসামী জামিন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ও পুনরায় হত্যাকান্ডে জড়িত হয়। সুতরাং, নতুন আইন করে নয় বরং বিদ্যমান আইনেই ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করণের বিষয়টি খুব বেশী প্রয়োজন। পাশাপাশি বিচার প্রার্থী ধর্ষিতা নারীর হয়রানী কমানোর বিষয়টি সামনে আনা উচিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচার চাইতে গিয়ে নারীকে ধর্ষণের চেয়েও আরো বেশী বিব্রতকর সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তার শরীর টেষ্ট থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত তাকে মারাত্মক শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের ভয়েই নারী ধর্ষণের বিচার চাইতে পারে না।

কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই গড়ে ১৫-২০ টি ধর্ষণের খবর পত্র পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ করেই দেশে এতো বেশী ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণ কি? মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশে ধর্ষণের মহামারী শুরু হয়ে গিয়েছে, নয়তো বিশেষ কোন ভাইরাসের সংক্রমণে মানুষ বেশী ধর্ষণে জড়িত হচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগে, এতদিন মিডিয়াগুলো কোথায় ছিল? কেন তারা এতদিন ধর্ষণের বিরুদ্ধে কোন সোচ্চার ভূমিকা পালন করেনি?

পবিত্র ধর্ম ইসলামে ধর্ষণ কারীর বিচার প্রকাশ্যে করার বিধান রয়েছে। ধর্ষক যদি অবিবাহিত হয় তবে তাকে জনপ্রকাশ্যে ৮০টি বেত্রাঘাত ও বিবাহিত ধর্ষকের ক্ষেত্রে জনসম্মুখে পাথর মেরে মৃত্যু নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে।

আমাদের দেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতিগ্ৰস্থ বিচার বিভাগ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহীনির অবহেলা গাফিলতি। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে মৃত্যুদন্ড কিংবা ক্রসফায়ারের মতো আইন প্রণোয়নের দাবির বিষয়টি অযৌক্তিক মনে করছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা এমন আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে 'বিচার বিভাগকে দুর্নীতি মুক্ত করা ও বিদ্যমান আইনে বিচার নিশ্চিত করলেই ধর্ষণের হার কমানো সম্ভব'

যে দেশের প্রতিটি শহর, জেলা, উপজেলায় লাইসেন্স প্রাপ্ত পতিতালয় রয়েছে, যে দেশে যুবক থেকে বুড়ো বয়সের পুরুষরাও নিয়মিত পতিতালয়ে যাতায়াত করে, সে দেশে ধর্ষণের হার কমবে কিভাবে? শুধুমাত্র ফাঁসির আইন করেই কি ধর্ষণ রোধ করা যাবে? ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন। প্রয়োজন সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ। প্রয়োজন সামাজিক ন্যায় বিচার, সুশাসন ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন।

মোঃ আরাফাত রহমান
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন