অদম্য সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুর রশিদ

এইচ কবির টিটু | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২০ | ০৬:২২:৫৮ পিএম
অদম্য সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুর রশিদ
একজন মুক্তিযোদ্ধা  Freedom fighter হল এমন একজন ব্যক্তি যিনি তার দেশের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বর্বর অত্যাচার থেকে মুক্তির লক্ষ্যে যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে থাকেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা বলতে এমন একদল জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা নিজেদের বা অন্যকারো রাজনৈতিক মুক্তি বা স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিরোধ আন্দোলনে সংগ্রামরত ছিলেন বা রয়েছে। যদিও সাধারণভাবে "মুক্তিযোদ্ধা" বলতে "মুক্তির জন্য লড়াইরত" বোঝায়, তবুও সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের নির্দেশ করতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বিপরীতে শান্তিপূর্ন পন্থায় আন্দোলনকারীর ক্ষেত্র তা ব্যবহারগতভাবে একিভূত করা হয় না।

আমি ৭১' এর মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি।এই যুদ্ধে ধনী পরিবারের সন্তানেরা সংখ্যায় খুব কম অংশের লোকজন অংশ নিয়েছিলো বলে মনে করি। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, খেটে-খাওয়া পরিবারের দেশপ্রেমিক পাগল দামাল ছেলেরাই মুক্তির সনদ আদায়ে বুকের রক্ত দিয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা বলছি।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার গফরগাঁও ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের ঢালী বাড়ির আব্দুর রাজ্জাক ঢালীর তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে চতুর্থ সন্তান আব্দুর রশিদ ছিলেন ছোটকাল থেকেই দেশপ্রেমিক স্বপ্নবাজ মানুষ।

আব্দুর রশিদ সেই কালজয়ী বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অতুলনীয় ভাষণ শুনে নিজের জীবনকে  দেশের জন্য উৎসর্গ করবেন বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন। আব্দুর রশিদের মত আরো কিছু জীবনবাজি রাখা তেজোদৃপ্ত যুবক শত্রু নিধনে প্রশিক্ষণ নিয়ে  রাইফেল, স্টেনগান, বেটাগান, এসএলআর, এলএমজি, টু-ইঞ্চ মর্টার, জি থ্রি রাইফেল, থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, ডিনামাইট, এন্টি এয়ার ক্রাপ্ট, মলোটে ককটেল, স্মোক বোম, আন আর্মড কম্বাট, বেয়নেট ফাইটিং সহ সব চালাবেন বলে মনস্থির করেন। বঙ্গবন্ধুর এটি ভাষণ নয়, যেন শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হাজারো শৈল্পিক অস্ত্রের লুকায়িত ট্রেনিং। এটি কোনো সাধারণ বক্তৃতা ছিল না। এটি ছিল স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত একজন অবিসংবাদিত নেতার হৃদয় নিংড়ানো অভিব্যক্তি। এটি একটি অমর কবিতা। সেই কবিতার ছন্দে যেন মাতোয়ারা হয়ে আব্দুর রশিদ কি এক মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিবারের কাউকেই কিছু না জানিয়ে মাত্র ৪০ টাকা পকেটে করে চলে যান ভারতের মেঘালয়ের তোরা পাহাড় অঞ্চলের পাদদেশে  ক্যাম্পে।তোরা সহ ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রায় একলক্ষ স্বপ্নবাজ দুর্দান্ত চৌকস গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের মাটিতে ৯০ হাজার গেরিলা প্রবেশ করে পাকিস্তানিদের উপর আক্রমণ শুরু করে।এই সংখ্যার মধ্যে এক যুবক আব্দুর রশিদ যার ভারতীয় মুক্তি নং-১০৫৭৮। চিতার ন্যায় চোখ জ্বলছে।অদম্য সাহসে এগিয়ে চলে এলএমজি কাঁধে আব্দুর রশিদ সহ এই গফরগাঁওয়ের দামাল ছেলেরা। দেশের অভ্যন্তরে ডুকে শুরু হয় ১৬ টি স্থানে গেরিলা এ্যাটাক। এক সময় সন্ধ্যা হয়ে আসে। একদিকে বিশাল জঙ্গল অন্যদিকে নদী। সামনে পাকবাহিনীর সদস্যরা। বেছে নেয়া হলো জঙ্গলেই রাত জেগে থাকবেন।গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেই অনুমান হলো পা মোটা মোটা লাগছে।

অন্ধকারে হাত চালাতেই পাঁচ আঙ্গুলের মাঝে উঠে এলো জোঁকের আঁটি। রক্ত খেয়ে বেশ মোটা হয়ে দুলছিল। প্রায় তিনদিন একবারও ভাতের সাথে দেখা নেই। কোমরে বাঁধা পানির বোতলটি প্রায় শূন্য।রাতের অন্ধকার শেষ হলে সূর্যের আলোর দেখা পাবো তো? এমনি ভাবে দিন যায় রাত আসে আমরা কজন বেঁচে যাচ্ছি শত্রুর নিশানা থেকে।এমনিভাবে হাজারো জীবন বাজী রাখা যুবকের সাহসী পদক্ষেপে মারো নয় মরো এই দীক্ষায় কেটে যায় ৯ মাস। বিজয় আসে হৃদয়ের রক্তক্ষরণের শ্রুতধারায়।আব্দুর রশিদের শরির যেন আর চলতে চায় না।ধান ক্ষেতের সোনালী রং ঢাকা পরলেও ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিশির বিন্দু পা ধুয়ে দিচ্ছিল।
 
মাঠ পেরিয়ে একটি গ্রামের বড় রাস্তায় পড়ে থাকা নারী-পুরুষের একত্রিত  লাশের স্তুপে দাঁত চালাচ্ছিলো শিয়ালের দল। এই স্তুপে পড়ে থাকা এক বৃদ্ধার লাশ দেখে আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে পিতা মাতার ছবি ভেসে উঠে। মূহুর্তে কাঁধে থাকা এসএলআর এ হাত চলে যায়। ফায়ার ফায়ার শব্দটি মুখে চলে আসে। উদীয়মান সূর্য ঠিক সামনের আকাশে।যেন রক্তে আঁকা লাল টিপ।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ স্বাধীনতার পর আর দশজন মানুষের মত জীবন শুরু করেন।তিনি দেশ গড়বার কাজে নিজেকে নানা ভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

শিক্ষাদানের মহান ব্রত যার কাজ তাকেই শিক্ষক বলা হয়। আব্দুর রশিদ জাতিগঠনের জন্য মহান পেশা শিক্ষকতা শুরু করেন।এই পেশায় তার সুনাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।তিনি গফরগাঁও উপজেলার তিনবার নির্বাচিত সাংসদ মরহুম আলতাফ গোলন্দাজের বাবা রুস্তম আলী গোলন্দাজের (রুস্তম আলী উচ্চ বিদ্যালয়) হাতে গড়া বিদ্যালয়ের শরিরচর্চা শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তার কাছে দীক্ষা পাওয়া বহু ছাত্র গফরগাঁও উপজেলা সহ দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  কর্মরত আছেন।খেলাধুলা হলো এমন একধরনের কাজ যা বিনোদনের জন্য অথবা কখনো কখনো জ্ঞান অর্জনের সরঞ্জাম হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা বিনদনের একটি স্বতন্ত্র অংশ যা শুধু মাত্র আনন্দ উপভোগের জন্য অথবা পুরস্কারের জন্য করা হয়। খেলাধুলা সাধারণত কাজের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এসব মূলত ঐতিহ্য, সৌন্দর্যোধ ও মিত্রতা রক্ষার্থে আয়োজন করা হয়। আব্দুর রশিদ ছিলেন দারুণ কাবাডি, ফুটবল, ভলিবল খেলোয়াড়। তিনি গড়েছেন মেধাবী স্কাউট দল। যার অবস্থান এখনও ঝলমলে রোদ্দুর্র হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। কোনো ব্যক্তির নিজস্ব গর্ব তার জ্ঞানের দীনতাকে প্রকাশ করে; যার জ্ঞান ও অভ্যাস যত গভীর, তার গর্ব ততই কম হবে। আব্দুর রশিদ কোনদিন নিজেকে বড় করতে গিয়ে অন্যকে ছোট করেনি। বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলেনি আমি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।

আব্দুর রশিদ শিক্ষকতা জীবন প্রায় শেষের দিকে তিনি তার তিন সন্তান ঢালী মোহাম্মদ মাহাবুবুল বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত, ডি,এম, মাজাহারুল আলম (মিথুন) সাংবাদিক ও শিক্ষক), সিরাত ফিহানা রিংকি অনার্স শেষ বর্ষ ও সহধর্মিণী খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গর্বিত আরেক শরিরচর্চা শিক্ষক মিনারা খাতুন কে নিয়ে দিন অতিবাহিত করছিলেন।তার ভিতরে কি যেন না পাওয়ার এক কষ্ট কাজ করতো।

গফরগাঁওয়ের গো-হাটার বিশাল অক্সিজেন সরবরাহকারী বৃক্ষ অশ্বত্থ এক প্রকার বট বা ডুমুরজাতীয় বৃক্ষের গোল চক্করে বাংলার প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের অবলোকন করতেন।

হয়তো ভাবতেন আমার ফেলে যাওয়া কর্ম স্মৃতি দেশপ্রেম প্রজন্ম আমাকে কি মনে রাখবে?

একদিন হঠাৎ তিনি সত্যই চলে গেলেন রেখে গেলেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের নানা মত নানাজনের বাংলাদেশ।

লেখকঃ
এইচ কবির টিটু
শিক্ষক ও সাংবাদিক  



খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন