সাইকেলিং এ তারুণ্যের জয়গান

শাহ্ ইমরান | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ০৪:০৯:৪৪ পিএম
সাইকেলিং এ তারুণ্যের জয়গান
সফর সঙ্গী মেরাজুল হক
আজ আপনাদের বলব আমাদের ৪৭৬ কিঃমিঃ সাইকেল জার্নির কথা। আমি মোঃ শাহ্ ইমরান, ৪র্থ বর্ষের মেডিকেল স্টুডেন্ট, আর্মি মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রাম।

আমার বন্ধু মেরাজুল হক, ঢাকা কলেজের ২য় বর্ষের স্টুডেন্ট। আমরা ২ জনই ভ্রমণপিপাসু। একসাথে অনেক জায়গায় ঘুরা হয়েছে। একটা জিনিস আমাদের ২ বন্ধুরই খুব নজর কাড়ে! তা হলো আমাদের মতো তরুণদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা!!! নানা কারণে আমরা তরুণ সমাজ প্রচন্ড রকমের বিষন্নতায় ভুগে থাকি। হতে পারে সেটা পড়াশোনা, পরীক্ষার রেজাল্ট, বেকারত্ব, পারিবারিক কোন সমস্যা বা প্রেম সংক্রান্ত কোন মানসিক আঘাত। যারা এই বিষন্নতায় ভুগে থাকে, বেঁচে থাকতে খুব কম মানুষই তাদের কথা শুনে থাকেন।

তাদেরকে একটু বুঝার চেষ্টা করেন। যখন তাদের মাঝেই কেউ আত্মহত্যা করে বসে তখনই কেবল সবার টনক নড়ে। তখন আসলে কিছুই করার থাকেনা। প্রতিটি জীবনই অমূল্য!! এরকমভাবে নিজেই নিজের জীবনকে শেষ করে দেওয়ার আসলে কোন মানে হয় না। জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া,এখানে থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই! নিজেকেই নিজের পথ তৈরি করে নিতে হয়।
এরকম একটা চিন্তা থেকেই আমরা ২ বন্ধু ইচ্ছা পোষণ করি এমন কিছু করার যা আমাদের তরুণ সমাজ কে উদ্বুদ্ধ করবে, জীবনে নতুনভাবে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগাবে। যেহেতু করোনা-ভাইরাসের জন্য গত ৫ মাসেরও অধিক সময় ধর সবকিছুতেই চলাচলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে আর তাছাড়া পাবলিক ট্রান্সপোর্টে হয়তো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ও একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই আমরা পরিকল্পনা করি সাইকেলে করে দীর্ঘপথ ভ্রমণ করব।

কিশোরগঞ্জ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জ যাব, তারপর নদীপথে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় এসে উঠব। সেখান থেকে আবার সাইকেলে করে পাকুন্দিয়ায় নিজ বাড়িতে এসে যাব। এরকম পরিকল্পনা ধরেই আমরা গত ২৮ শে আগষ্ট ভোরবেলায় বাড়িথেকে বের হই। ভৈরব বাজার পৌঁছাই সকাল ১০ টায়। ওখান থেকে সকালের নাস্তা করে আবার সাইকেল চালানো শুরু  করি। একটানা অনেকক্ষণ সাইকেল চালানোর ক্লান্তি দূর হয়ে যায় যখন হবিগঞ্জ জেলায় প্রবেশমুখের স্বাগতম বোর্ডটা দেখতে পাই!

মাধবপুর পার হওয়ার পর হটাৎই সিদ্ধান্ত নেই ব্যারিস্টার সুমন সাহেবের সাহেবের সাথে দেখা করব, সাথে ওনার ফুটবল একাডেমিটাও দেখে যাব। হাইওয়ে থেকে ডানে মোড় নিয়ে ঢুকে যাই চুনারুঘাট এর রাস্তায়! রাস্তার ২ পাশেই চমৎকার সুন্দর চা-বাগান দেখতে দেখতে যখন এগোচ্ছিলাম আরও বিস্মিত করে হটাৎই উপস্থিত হয় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান! বুনো সৌন্দর্য দেখে আমরা যারপরনাই খুশি হয়ে যাই!! উদ্যান পার হয়ে সন্ধ্যায় উপস্থিত হই ব্যারিস্টার সুমন ফুটবল একাডেমির মাঠে। আন্তরিকতার সাথে সুমন সাহেব আমাদের স্বাগত জানান! উনার সাথে দেখা করে আমরা আবার রওনা হই শায়েস্তাগঞ্জ নতুন বাজারের উদ্দেশ্যে। রাতে ওখানেই থাকব বলে ঠিক করি। রাত ১০ টায় আমরা শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে হোটেল ইনসাফে উঠি। পরদিন সকাল ৮ টায় নাস্তা করে বের হয়ে যাই। সিলেট তখনো প্রায় ৯০ কিঃমিঃ বাকি। পথে শ্রীমঙ্গলের আনারসের স্বাদ নিয়ে নতুন উদ্যোমে সাইকেল চালানো শুরু করি। শেরপুর উপজেলায় পৌঁছানোর একটু আগে মেরাজুলের সাইকেলের চেইন নষ্ট হয়ে যায়। সাইকেল ঠিক করে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার রওনা হই সিলেটের উদ্দেশ্যে। ৩.৩০ এ সিলেট পৌঁছাই আমরা। আমার বন্ধু মোস্তাকিম সেখানে আমাদের রিসিভ করে। ২ দিন সিলেটে অবস্থান করে বিছানাকান্দি, রাতারগুল, হযরত শাহ্ জালাল রহঃ এর মাজার সহ শহরের অন্যান্য জায়গায় ঘুরাঘুরি শেষে ১লা সেপ্টেম্বর রওনা হই সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের উদ্দেশ্যে। সিলেট থেকে ১০২ কিঃমিঃ তাহিরপুর।সারাদিন সাইক্লিং করে সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে পৌঁছে যাই তাহিরপুর। তারপর নৌকা করে চলে যাই বাদাঘাট বাজারে। তারেক বোর্ডিং এ রুম নেই আমরা। রাত্রিবেলা বাদাঘাট বাজার ঘুরে সেদিনকার মত সাইকেল চালানো ইস্তফা দেই। পরদিন ভোরে নাস্তা করে বের হয়ে যাই টেকেরঘাটের উদ্দ্যেশ্যে। পথে অনিন্দ্য সুন্দর সুনামগঞ্জের বিখ্যাত শিমুলবাগান,জাদুকাটা নদী,বারেকটিলার সৌন্দর্য উপভোগ করে দুপুরে পৌঁছাই নীলাদ্রি লেকে। পাহাড়ের পাদদেশে চমৎকার সুন্দর এই নীল পানির লেক দেখে গোসল করার লোভ আমরা কেউই সামলাতে পারিনি! প্রায় একঘন্টা সাতরানোর পর লেক থেকে উঠে চলে যাই টেকেরঘাট এ।

মিঠামইনের উদ্দেশ্যে লঞ্চ বা ট্রলারে উঠা। দূর্ভাগ্যবশত সেদিন বা তার পরদিনও ট্রলার বা লঞ্চ কোন কিছুই নেই যা মিঠামইন বা কিশোরগঞ্জে যাবে। একজন বলল যে সুনামগঞ্জ শহরের লঞ্চ ঘাট থেকে ৯ টা বাজে ১ টা  লঞ্চ ছাড়বে। বাধ্য হয়ে আরো ৫৫ কিঃমিঃ সাইকেল চালিয়ে টেকেরঘাট থেকে সুনামগঞ্জ শহরের লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছাই। ওখানে পৌঁছে যে দুঃসংবাদটা পাই তা হলো কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের উদ্দেশ্য লঞ্চ যায় জামালগঞ্জের সাচনা ঘাট থেকে রাত ১১ টা বাজে। যার দূরত্ব আরো ২৩ কিঃমিঃ। তখন বাজে রাত ৮ টা। ৩ ঘন্টা সময় পাচ্ছি লঞ্চ ধরতে। শহরের পানসী রেস্তোরাঁ থেকে রাতের খাবার পার্সেল করে আবারও রওনা হই সাচনা লঞ্চ ঘাটের উদ্দেশ্যে। প্রচন্ড বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ রাস্তা দিয়ে ২৩ কিঃমিঃ পথ যেতে আমাদের সময় লেগেছে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট। স্বাভাবিকভাবে যেখানে আমরা ১ ঘন্টায় ২০ কিঃমিঃ যেতে পারি।

রাত্রিবেলায় দূর্গম এই ২৩ কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে ঠিক ১৫ মিনিট কম এগারোটায় আমরা পৌঁছাই সাচনা লঞ্চ ঘাটে। সাইকেল গুলো তুলে নিয়ে বসতেই সাইরেন বাজিয়ে লঞ্চ ছেড়ে দেয় মিঠামইনের উদ্দেশ্যে। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাড়ি ওখানে।উদ্দেশ্য উনার বাড়ি দেখে হাওড়ের সেই বিখ্যাত রাস্তায় সাইকেল চালাব! প্রায় ৬ঘন্টা একটানা সাইকেল চালানোর যে ক্লান্তি ছিল তা নিমিষেই দূর হয়ে যায় সুরমা নদীর সাথে চমৎকার সুন্দর জোৎস্না দেখে! পূর্ণিমা ছিল সে রাতে। নদীর উপর চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছিল!! জোৎস্না আর নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সারারাত পার করে পরদিন সকাল ৯.৩০ এ পৌঁছে যাই মিঠামইনে। নাস্তা করে সপ্তম দিনের মত শুরু করি আমাদের সাইকেল যাত্রার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত রাস্তা, মিঠামইন-অষ্টগ্রাম রাস্তায় যাত্রা। রাস্তার ২ পাশে হাওড়েন মনমাতানো সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা ভাতশালা সেতুতে পৌঁছাই। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার মিঠামইন লঞ্চঘাটে পৌঁছুই। এবারের উদ্দেশ্য নিকলি হাওড়। ২.৩০ ঘন্টার ট্রলার জার্নি শেষে দুপর ৩ টায় পৌঁছুই নিকলি হাওড়ে। অল্প কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে রওনা হই বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে। নিকলি থেকে পাকুন্দিয়া ২২ কিঃমিঃ। এই পথটুকু সাইক্লিং করে বাড়ি এসে পৌছাই বিকাল ৫টা ২০ এ।

আর এরই সাথে আমাদের ৪৭৬ কিঃমিঃ সাইকেল যাত্রার সমাপ্তি হয়।

এই সাতদিনের সাইকেল যাত্রায় অনেক কিছু শিখেছি, পেয়েছি জীবনে বেঁচে থাকার নতুন উদ্দেশ্য। অনেক মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি। দেখেছি আলাদা আলাদা মানুষের জীবন সংগ্রাম। একটা মানুষকেও পাইনি যারা শত ব্যর্থতার মাঝেও তাদের জীবনের হাল ছেড়ে দিয়েছে। সুনামগঞ্জের কয়লা শ্রমিক থেকে শুরু করে পাথর কুড়ানো সেই মা ও বাচ্চা একটাই শিক্ষা দেয়, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। জীবন মানেই  সংগ্রাম আর এগিয়ে যাওয়া।

নিজেকে ভালোবাসো, নিজের আশেপাশের মানুষগুলোকে ভালোবাসো। জীবন প্রকৃত অর্থেই সুন্দর! এজীবন অকালে ঝরে যাওয়ার জন্য নয়।

পরিশেষে ধন্যবাদ দিতে চাইব আমার পরিবারকে যারা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে। আর আমার কলেজের সিনিয়র ইমরান ভাই সহ নাম না জানা সেসকল মানুষকে যারা এই অচেনা পথে নানাভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছে।

লেখক, শাহ্ ইমরান
শিক্ষার্থী
৪র্থ বর্ষ, আর্মি মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রাম।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন