আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক উদ্দেশ্যহীন লক্ষ্যের পিছনে ছুটছে!

আবদুর রহিম, কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: রবিবার, ১৪ জুন ২০২০ | ০১:০১:৩২ পিএম
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক উদ্দেশ্যহীন লক্ষ্যের পিছনে ছুটছে!
ইদানিং প্রায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ছোট-বড়, ধনী-গরীব, ছাত্র-অছাত্র, যুবক-বৃদ্ধ কমবেশি সবার মধ্যেই যেন অতিরিক্ত স্বাধীন হবার প্রবণতা। অর্থাৎ কেউ কাউকে মান্য-গণ্য করে না, শ্রদ্ধা করে না। ‘আমরা সবাই রাজা রাজার রাজত্বে' ভাবখানা। এতে করে কি আমরা লাভবান হচ্ছি? আমাদের উদ্দেশ্য কি মানুষ হিসেবে? এসব তাত্ত্বিক কথা!

বাস্তব সত্য হল-অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই ধারণা ‘খাও দাও ফূর্তি কর তথ্য প্রযুক্তির কারবার কর। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা এমনভাবে গড়ে তুলতে ব্যস্ত যেখানে ছেলেমেয়েরা সারাক্ষণ পড়ালেখা, ছবি আঁকা, প্রাইভেট পড়া, নাচ-গান, বিতর্ক ইত্যাদিতে সর্বদা আকুল। তার উপর কম্পিউটার, টিভি, ভিডিও গেমস তো আছেই। অন্যদিকে বাবা-মায়ের সময় কোথায় সন্তানের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া। কেননা, তাদের ধারণা, তারা যা করছে সন্তানের ভালোর জন্যই করছে। ফলে চাকরি রক্ষা করতে যেয়ে আজকে অমুক পার্টি, কালকে তমুক পার্টি কিংবা ব্যবসার জন্য বিভিন্ন ব্যস্ততা।

অপরদিকে বিপুলসংখ্যক অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী জানেই না কিভাবে সন্তানদেরকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। ফলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এক উদ্দেশ্যহীন লক্ষ্যের পিছনে ছুটছে। যার চরম পরিণতির মূল্য আমাদেরকে দিতে হবে।

ভিনদেশী এক প্রবাদ আছে, তুমি যদি বৃক্ষরোপণ করতে চাও তাহলে দশ বছরের পরিকল্পনা নাও আর যদি মানুষ রোপণ করতে চাও তাহলে একশ' বছরের পরিকল্পনা নাও। অর্থাৎ মানুষকে মানুষের মত করে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই তাদেরকে শিশুকাল থেকেই গড়ে তুলতে হবে। না হলে তাকে গড়ে তোলা খুবই কষ্টের। এ জন্য গৃহ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজ মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি।  

ছাত্রজীবনে বন্ধুত্বের নামে অবাধ মেলামেশা যেন আজকের সমাজে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এটা কোন বিষয়ই না। অভিভাবকদের চোখের সামনে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ কিছু বলছেন না। ফলে প্রেমিকার সামনে আত্মহত্যা, প্রেমের জন্য বাবা-মাকে হত্যা, অসংখ্য কর্মকান্ড পত্র পত্রিকা-মিডিয়ার পাতায় দেখতে হচ্ছে।

হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, পাশবিক অত্যাচার এমনকি আড়াই বছরের শিশুকেও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। এ কোন ধরনের সভ্যতা? এ কোন সমাজ আমরা উপহার দিচ্ছি? যে সমাজ হবে ডিজিটাল সমাজ। তাহলে এটা ধরে নেব যে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে ডিজিটাল সমাজের নমুনা হবে এটা। এই জন্যে কি সমাজের বিবেকবান মানুষের কিছুই করার নেই?

মনে রাখতে হবে সবকিছুকেই ডিজিটাল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। স্নেহ, আবেগ, ভালবাসা, সুখ-দুঃখ, মায়া-মমতা এসব কোনো ডিজিটাল দিয়ে আমরা পরিমাপ করব? এসব পরিমাপ করার যন্ত্র কি আবিষ্কার হয়েছে? নাকি এসবকে অস্বীকার করেই সংখ্যা তত্ত্বের ভিত্তিতেই বাংলাদেশকে গড়তে চাই। সময় এসেছে এগুলো নিয়ে বিবেকবান সমাজকে চিন্তা করার।

যান্ত্রিক জীবনের বাস্তবতাকে যেমন আমরা অস্বীকার করতে পারব না। তেমনি মানবীয় দিকগুলোকেও আমরা এড়িয়ে যেতে পারব না উপেক্ষা করতে পারব না। তাই দুটো দিকের সমন্বয় করেই আমাদের পথ চলতে হবে। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে প্রযুক্তি অগ্রসর হবে। তেমনি মানবীয় দিকগুলো সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হউক এটি একটি সুন্দর সমাজের দাবি। মানবীয় দিক বিকশিত না হলে সে সমাজ কখনও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। মনুষ্যত্ব বিকাশের দিকগুলো প্রকাশিত হবার জন্য পরিবার, সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিশু মনে নৈতিক মূল্যবোধগুলো উন্মেচিত হবার জন্য ছোটবেলা থেকে তাদের অন্তরের মধ্যে গেঁথে দিতে হবে পৃথিবীতে মানুষ এসেছে দায়িত্ব নিয়ে। এই দায়িত্ব পালন করতে হলে সর্বপ্রথম নিজেকে আবিষ্কার করতে হবে। মানুষ হিসেবে তার ভিতর যে নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে তা জাগ্রত করতে হবে। সাহসী, বিনয়ী, সত্যবাদী, উদারতা, ত্যাগী, ধৈর্য্যশীল, স্নেহ, মায়া-মমতা, বড়দের শ্রদ্ধা করা, ছোটদের ভালবাসা, সম-বয়সীদের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণ, অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া।

দেশের প্রচলিত আইন-কানুন মেনে চলা। দেশ প্রেম। বিশ্ব প্রেম ইত্যাদি অসংখ্য মাননীয় গুণাবলীর বিকল্প ঘটাতে পারলেই মানবজীবনের সার্থকতা। অনেকেই বলবেন এসব কাজ তো শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই শিখানো হয়। মানছি শিখানো হচ্ছে, কিন্তু তা কি নির্ভুল এবং প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার শিক্ষা ব্যবস্থা? যদি তাই হতো তাহলে যাদের বই খাতা কলম থাকার কথা তাদের হাতে অস্ত্র কিংবা অন্য কোনো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হবার কথা নয়?

তাহলে কি বলব সমাজ এখানে ব্যর্থ, না তা আমি বলতে চাই না। কেননা সমাজের অধিকাংশ লোকই ভাল। তবে এই ভাল মানুষদেরকে আমরা সুযোগ দিতে চাই না, কিংবা ভাল মানুষরা নিজেরাও এগিয়ে আসতে চায় না। অথবা আমাদের সমাজ এখন। ‘ঠগ বাছতে গাও উজাড়’ হবার উপক্রম কোনটা? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে সমাজের মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে।

মিথ্যাচার, প্রচার-প্রপাগান্ডা এগুলো করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে কিন্তু সভ্য সুন্দর সমাজ উপহার দেয়া যাবে না। সত্যের মুখোমুখি হয়ে সুন্দর সমাজের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাহলেই না সুন্দর সমাজ আসা করা, যায় তার আগে না। সচেতন সমাজ কতটুকু দায়িত্বশীল আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে? যে প্রজন্ম হবে নির্ভীক সত্য ও সুন্দরের প্রতীক।

বাংলাপত্রিকা/এসএ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন