পুলিশের করোনাকালে অদম্য যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প বলার সময় কবে আসবে

এস.এম. রফিকুল হক রফিক, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২০ | ১২:১৭:২৬ এএম
পুলিশের করোনাকালে অদম্য যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প বলার সময় কবে আসবে
অফিসে যাবার সময় সরকারী বাসভবনের গেট পার হতেই একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেল, পুলিশের হলুদ রেইনকোট পরা  কেউ একজন সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, পেছনে ৪-৫ বছরের এক ছেলে বসে আছে পা দুলিয়ে। আমি মোবাইল নিয়ে ছবি তুলতে চাইলাম,গাড়ীর পেছনের সিট থেকে নিতে পারছিলাম না, আমার বাসা থেকে অফিসে যেতে বাসার গেট পেরিয়ে একটু গিয়েই ডান দিকে মোড় নিয়ে  সার্কিট হাউজ ক্রস করে যেতে হয়; সাইকেলটা চলে যাচ্ছে সোজা নাক বরাবর, ড্রাইভার জিয়া কে বললাম ডানে না গিয়ে সোজা গিয়ে আস্তে আস্তে ওকে ফলো করতে, বডিগার্ড মনসুরকে বললাম সামনের সিট থেকে ছবি তুলতে ; এত সুন্দর একটা দৃশ্য আমি মিস করতে চাই না। সাইকেল ফলো করে এসে আমার ইউনিটের ঐ পুলিশ সদস্যকে থামালাম; আচমকা এসপির গাড়ী দেখে একটু ভড়কে গেল, পেছনে বাচ্চাটা মাস্ক মুখে চুপচাপ দেখছিল,কোথায়  যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করতেই বললো ছেলের চুল কাটাতে। বললাম নিজের ঘরে কেটে দিলেই তো পারেন।

গতকাল থেকেই বিষন্নতা কুড়েকুড়ে খাচ্ছে আমাকে। বাবার সাইকেলের পেছনে ছেলেকে দেখেই আমার মনে পরেছিল পুলিশ লাইনের পুলিশ পরিদর্শক আবদুল জলিলের হাসি মাখা মুখ আর বিশাল শরীরটা। গত মঙ্গলবার তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, মৃত্যুর পর জানা যায় তার করোনা পজিটিভ। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের ২০ তম সদস্য যিনি করোনা  যোদ্ধা হিসেবে শহীদ হলেন।

জলিল সাহেব গত ২৮ মে জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে সাথে সাথে পুলিশ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত কোয়ারেনটাইনে নিয়ে যাই।  পরদিনই নমুনা সংগ্রহ করা হয় তার। কয়েকদিন পর তার জ্বর ভাল হয়ে গেলে তিনি বহগুড়ায় তার পরিবারের নিকট যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে  ওঠেন; দুই তিন দিন তাকে প্রবোধ দিয়ে রাখা হয়, রিপোর্ট আসলে যাবেন; কিন্তু রিপোর্টের আর দেখা মেলেনি।ততদিনে তিনি মোটামুটি সুস্থ, জ্বর কমে গেছে; তিনি আরো জোরাজুরি করলে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বাসায় যেতে বলি, আর বলে দেই কোয়ারেনটাইনেই থাকবেন ,রেজাল্ট না পাওয়া পর্যন্ত; ওনার হার্টের সমস্যার জন্য ভাল একজন ডাক্তার দেখাতে বলি, আমার সাথে সরাসরি কথা হয়নি; আমার পাশে বসে সহকর্মী মেনহাজ কথা বলার সময় লাউড স্পিকারে পাশ থেকেই জোরে জোরে বলছিলাম আমি।জেলা পুলিশের এমবুলেন্স করে গত পরশু তার বগুড়ার বাড়ীতে পৌছে দেওয়ার পর আমাদের করোনা ফোকাল পয়েন্ট খোজ নিয়ে কথা বলে জেনেছিলেন তিনি সুস্থই আছেন। গত তিন মাসে অসুস্থতা জনিত কারনে অন্তত ১০ জনকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের বাড়ীতে পাঠাতে এমবুলেন্স ই ব্যবহার করেছি যাতে গনপরিবহনে অন্যদের সাথে শেয়ার করতে না হয়। তখন ঘুনাক্ষরেও মনে হয়নি  এ যাওয়াই শেষ যাওয়া।

গতকাল সকল ইউনিট ইনচার্জদের সাথে মিটিং করছিলাম, এ সময় আরও ওয়ান আলমগীর জানালো জলিল সাহেব মারা গেছেন; আমি বললাম ,আরে কি বলো ,ভাল করে শোন কোন জলিল সাহেব; ফোনেই ওনার ছোটভাই আর ছেলের সাথে কথা হল, বাড়ীতে যাওয়ার একদিন পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরলে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শুনে কি বলবো বা কি করবো  বুঝতে পারছিলামনা। ওনার সাথে শেষ কথাও হয়েছিল এই কনফারেন্স রুমেই, ঈদের একদিন আগে; আমার সহকর্মীদের জন্য ঈদের উপহার হিসেবে পানজাবী আনিয়েছিলাম অনলাইনে অর্ডার করে, প্রায় ১ শ" র মত পান্জাবি অর্ডার করেছিলাম, যা তিন লটে এসেছিল; সবারটা আসলেও জলিল সাহেবেরটা ঐ লটে আসেনি, রসিকতা করে বলেছিলাম আপনার পান্জাবির মাপ তো অনেক বড়, তাই পেতে  দেরি হচ্ছে। পরে পাঞ্জাবি হাতে পেয়ে ওনাকে দিয়েছিলাম।ঈদের দিন সেই পাঞ্জাবি পরে একসাথে দুপুরের খাবারও খেয়েছেন আমাদের সবার সাথে। তিনি পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকায় , যখনই গোলঘরে বসতাম কথা খুব একটা না হলেও দেখা হত। কষ্টের বিষয় হল তার মৃত্যুর খবর যখন পাই তখন পর্যন্ত তার নমুনার রিপোর্ট আমরা পাইনি, অথচ ১০ দিন হয়ে গেছে, আমি জানি এখানে দিনে ২৫ টা নমুনা পরীক্ষা করা হয়; অনেক নমুনা জমে আছে, তবে পুলিশ সদস্যরা প্রথম থেকেই  যেভাবে করোনার ঝুকি নিয়ে কাজ করছেন সেক্ষেত্রে তাদের নমুনাগুলো পরীক্ষাতে সংশ্লিষ্টরা আরো মনোযোগী হবেন এটা আমরা আশা করতেই পারি। জলিল সাহেব দীর্ঘদিনের হার্টের রোগী, রিপোর্টটা আগে পেলে আমরা আরো সতর্ক হতাম, তিনি ছুটির জন্য প্রতিদিনই আলফা ২ কে কল করছিলেন, শেষ ছুটি গিয়ে তিনি আর ফিরলেননা। এর আগে মারা যাওয়া সকল সদস্যকে জেলা পুলিশের ফেসবুক পেইজে স্মরন করেছি, আমি কখনওই ভাবিনি আমার নিজ ইউনিটের সদস্যর মৃত্যু সংবাদ আমাকে লিখতে হবে।

সকালে বাবার পেছনে ছেলেকে সাইকেলে দেখে  বারবার মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের দুই লক্ষাধিক পুলিশ সদস্যের সন্তানেরা অনেকেই অপেক্ষা করে আছে এভাবে বাবার পেছনে সাইকেলে চড়ার, ভেতরে ভেতরে পুলিশ সদস্যরা গুমরে মরছে একটু বাড়ীতে যাওয়ার জন্য, আবার নিজের পরিবারের কথা ভেবেই সে চিম্তা পরক্ষনেই মন থেকে মুছে ফেলছে।আমিও ঠিক করে রেখেছিলাম এই সপ্তাহেই বেশ কিছু সদস্যকে ছুটিতে ছাড়বো। করোনার শুরু থেকে দিনরাত কাজ করে অনেক সদস্য ক্লান্ত, প্রথম থেকেই চেষ্টা করছিলাম তাদেরকে ভাল রাখতে, এদিএজন্য সকল সুরক্ষা সামগ্রীর পাশেপাশে মাঝেমাধেই মাস্ক বা নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহার না করলে কড়া ভাষায় বকাঝকা করেছি, শাস্তিও দিয়েছি কয়েকজনকে; নিয়মিত রোলকল নিয়ে বুঝিয়েছি । ইতিপূর্বে মাত্র একজন অফিসার ইনচার্জ , ডিএমপি থেকে আসা দুই নারী সদস্য করোনা পজিটিভ  হলেও ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠায় আমি নিজেও একটু আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম। ইতিপূর্বে ছুটিতে গিয়ে আটকে থাকা প্রায় ১০০ শত ফিরে আসা শুরু করেছে, তাদের জন্য আলাদা ভবনে বাধযতামুলক ১৪ দিন কোয়ারেনটাইন করে রেখেছি, ভেবেছিলাম এরা যোগদান করলে অন্যরা ছুটি যেতে পারবে, জলিল সাহেবের মৃত্যু ও নতুন করে আক্রান্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য আমাকে সে চিন্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য করলো ।

এ লেখা যখন লিখছি তখন খবর পেলাম আমাদের টিআই সরোয়ার সাহেবের রিপোর্ট পজিটিভ, ওনাকে সাথে নিয়ে ঈদের দুই দিন পর রাত ৮-১০ টা আমি বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান করেছি। আমাদের ট্রাফিকের সদস্যরা যেভাবে মাস্কবিহীন মানুষকে ট্রাফিক আইন মানাতে দায়িত্ব পালন করেন সেখানে আক্রান্ত না হওয়াটাই বড় চ্যালেন্জ।কাল দেখলাম সিএমপির সম্মানিত কমিশনার Mahabub Ripon স্যার ও আক্রান্ত, যিনি প্রথম থেকেই চট্টগ্রাম মহানগরবাসীকে ভাল রাখতে কাজ করে চলেছেন।নিয়েছেন অনেক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।স্যারের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। নামাজ শেষে দোয়ার প্রথমেই থাকে আমার পরিবার আর জেলা পুলিশের সদস্যরা, কুড়িগ্রামের মানুষেরা, বাংলাদেশ পুলিশের সকল সদস্য, যাতে এই মহামারীর সময়ে সকলে সুস্থ থাকে।

আমি মনে প্রাণে চাই,এই ছবির মত সকল পুলিশ সদস্যরা শীঘ্রই ছুটিতে  গিয়ে নিজের সন্তানদের এভাবে সাইকেলের পেছনে নিয়ে , অথবা স্বপরিবারে মটর সাইকেলে ঘুরে বেড়াবে পড়ন্ত বিকেলে, স্ত্রী সম্তানদের নিয়ে শপিংমলে গিয়ে মেটাবে তাদের অনেকদিনের জমে থাকা বায়না, আর শোনাবে  করোনাকালে অদম্য যোদ্ধা হয়ে ওঠা মানবিক পুলিশের গল্প। কবে আসবে সেইদিন?

পুলিশ সুপার কুড়িগ্রাম মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান এর ফেসবুক ওয়াল থেকে 

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন