আদিল মাহমুদের ‘অর্থনীতি’

আদিল মাহমুদ | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে ২০২০ | ১২:৩৭:০৪ পিএম
আদিল মাহমুদের  ‘অর্থনীতি’
করোনা, নভেল করোনা, কোভিড-১৯, ভাইরাস সবই মানবজাতির ব্যাধি বা অসুখ। যুগ যুগ ধরে এগুলো পৃথিবীতে এসেছে, আসছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে। চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতির সাথে সাথে এই সব করোনায় মানুষের মৃত্যুর হারও কমেছে, প্রতিষেধকও তৈরী হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে, কিছু দিন আগে বা পরে।

কোভিড-১৯ ছোঁয়াচে, তাই মানুষ খুব ভীত ও তটস্থ্য। ভাইরাস যখন এতোই ছোঁয়চে, এটার প্রতিষেধক যেহেতু এখনো চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা তৈরী করতে পারেন নাই তখন এর বিকল্প ঔষধতো আমাদের আছে! আর সেই ঔষধ হচ্ছে নিরাপদ দূরত্ব ও সচেতনতা। আমরা যখন ছোয়াছুয়ে নিয়ে এতোই বুঝি, তখন নিরাপদ দূরত্ব ও সচেতনতার ঔষধটা ব্যবহার করলেই তো পারি!

আমরা নিরাপদ দূরত্ব ও সচেতনতা মানব না, আবার ছোয়াছুয়েও সহ্য করবনা তাতো হতে পারেনা। আপনি সচেতন এটাই কোভিড-১৯ এর মহা প্রতিষেধক। টিকা আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত, লক ডাউন দিয়ে হয় তো সংক্রমনের মাত্রা কিছুটা কমানো যাবে, কিন্তু পুরোপুরি কি সম্ভব? আবার মানুষ কি লক ডাউন পুরোপুরি মানছে বা মানব নিজেরা কি সচেতন? ভ্যাকসিন হয়তো একদিন তৈরী হবে এবং কোভিড-১৯ মরবে। তারপর কি হবে? তারপর হয়তো বা কোভিড-২০, কিংবা কোভিড-২১, কিংবা অন্য কিছু আসবে, তখন কি হবে! আবার কি লক ডাউন, সেই চিন্তা কি কারো মাথায় রাখে! যতদিন না বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞান আরো অনেকগুন শক্তিশালী না হবে কিংবা চির টিকা আথবা আজীবন টিকা না তৈরী হবে ততোদিন মানব সভ্যতাকে সব সময় বিভিন্ন প্রজাতির ভাইরাসের মোকাবেলা করে যেতে হবে এবং এটাই সত্যি।

আবার এটাও মনে রাখতে হবে যে, অথনৈতিক উন্নতি বা অর্থনীতির অগ্রযাত্রা একবার ধ্বংশ হয়ে গেলে হাজার বছরেও তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আজকে বাঙ্গালী জাতির যে অগ্রযাত্রা, শূন্য থেকে উন্নতশীল দেশের কাতারের দিকে যে ভাবে ধাবিত হচ্ছে তা সামান্য একটি ভাইরাসের কাছে ধ্বংশ হতে পারেনা!বাংলাদেশের হক উদ্ধার ও স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ বাঙ্গালী প্রাণ দিয়েছে, বিনীময়ে স্বাধীনতা ও অর্থনীতি ফিরে পেয়েছে। যদি বাঙ্গালী জাতি হানাদারদের সব কমর্কান্ড চোখ বুজে মেনে নিত, তবে হয়তো ৩০ লক্ষ শহীদ হতো না কিন্তু বিনীময়ে না খেয়ে এই স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে অন্তঃত ০৫ কোটি মানুষ মারা যেত। তখনকার ৩০ লক্ষ শহীদের বিনীময়ে আজকে সাড়ে ৭ কোটি থেকে ১৭ কোটি মানুষ ভালভাবে বেঁচে আছে, শুধুমাত্র স্বাধীনতার জন্য। আর স্বাধীনতার জন্য আমরা হারিয়েছি ৩০ লক্ষ নিষ্পাপ প্রাণ এবং বিনীময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা, সাবভৌমত্ব ও অর্থনীতি।

স্বাধীনতার ব্যাখ্যা অনেক, তাই বিস্তারিত না বলাই ভাল।তবে মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতা ছাড়াও মানুষ বাঁচে, কিন্তু সেই বাঁচাকে বাঁচা বলে না। বাঙ্গালীরা ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই শোষনের স্বীকার হয়ে অর্ধমৃত বেঁচে ছিল, পরে আরো কঠোর পাকিস্তান। আমার মনে পড়ে, তৃতীয়, চর্তুথ শ্রেণীতে পড়া কালে একটি কাঠ পেন্সিলকে অর্ধেক করে স্কুলে যেতে হতো, কারন কি শুধু আমরা গরিব! না, তা নয় বরং তখন আমাদের অর্থনীতি ভঙ্গুর ছিল। ব্রিটিশদের পর পাকিস্তানীরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিল, অর্থনীতির মেরুদন্ডকে ভেঙ্গে দিয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী অল্প সময়ে কি-ই বা আর করা যায় বলুন? ধীরে ধীরে অনেক বাঁধা বিপত্তি পাড় হয়ে আজ আমাদের অর্থনীতি ভাল একটা পর্যায়ে এসেছে। পোষাক, কাপড়, পাট, ঔষধ,কৃষি এমনকি জাহাজ শিল্পেও প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এখন আর আমাদের ছেলে মেয়েরা কাঠ পেন্সিল অর্ধেক করে স্কুলে যেতে হয় না, বইয়ের অভাবে স্কুল বন্ধ হয় না, খালি পায়ে স্কুলে যেতে হয় না, আধা খেয়ে থাকতে হয় না, না খেয়ে মরতে হয় না। কারন শুধুমাত্রই অর্থনীতি। অর্থনীতি ভাল আছে বলেই আজ আমরা মাথা উচু করে কথা বলতে পারছি। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করছি, আরো অনেক কিছু করছি। শুধু মাত্র স্বাধীনতা ও অর্থনীতির কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতা ও অর্থনীতি নিবিড় সম্পর্কিত কারন, স্বাধীনতা না আসলে আরো ৫০০ বছরেও বাংলাদেশীরা এই বৃহৎ অর্থনীতি দেখতে পেত না। অর্থনীতির পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় বিরত রহিলাম, কারন বাংলাদেশের অর্থনীতি যে বর্তমানে অত্যধিক শক্তিশালী ও দ্রুত অগ্রসরমান তা ছোট বালকও জানে।

শুধু দুঃখ একটাই, তিলে তিলে গড়া আমাদের এই বিশাল অর্থনীতি সামান্য একটি ভাইরাসের কাছে ধ্বংশ হয়ে যাবে? আমরা সচেতন হয়ে নিজেরাইতো ভাইরাসের মোকাবেলা করতে পারি। তাই বলে অর্থনীতিকে ধ্বংশ করে দিয়ে মোকাবেলা করা কোন ভাবেই যুক্তি সঙ্গত নয়। অর্থনীতির গতিধারা সচল রেখে, নিজেরা সচেতন হয়েই শুধু ভাইরাসের মোকাবেলা করতে হবে। ছোট একটি উদাহরন না দিলেই নয়। তা হলো কোভিড-১৯ কর্তৃক মৃত্যু ও সুস্থ্যতার হার। অদ্য ১২মে পর্যন্ত এই ভাইরাসে বাংলাদেশে ৩১৪৭জন সুস্থ্ হয়েছে ও ২৫০জন মারা গেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৬৬৬০ জন। ধরুন আগামী ৪ মাসে টিকা আসবে না বা আরো ০৬ মাস লাগবে বা স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো ৯ মাস? তাহলে এই হারে চলতে থাকলে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু হবে অনুমান প্রতি দিন ০৮ জন হারে, বাড়িয়ে বললে ২০ জন হারে, আরো বাড়িয়ে বললে ৫০ জন হারে যদি মারা যায় তাহলে সাধীনতা যুদ্ধের আলোকে ২৫০+১৩৫০০ = ১৩,৭৫০ জন মানুষ মারা যাবে, বিনীময়ে অর্থনীতি বাঁচবে। আর যদি লকডাউন চলতে থাকে তবে ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাবে খাদ্য সংকটে। আমরা ১৯৭১ সালে অর্থনীতির জন্য ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছি। আর এখন অর্থনীতিকে বাঁচাতে ১৩৭৫০ জন শহীদ হতে পারব না? ধরুন না এটা আরেকটি স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য। তাছাড়া ০৯ মাসের আগেও তো টিকা আসতে পারে কিংবা বাংলাদেশে করোনা, সচেতনতার ফলে এমনিতেই ধ্বংশ হয়ে যাবে।

পরিশেষে বলতে চাই, এখন ধৈর্য্য ধরার সময়। অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য আপনার আমার সকলকেই সামাজিদ দূরত্ব ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সরকারের বিধি নিষেধ মেনে চলতে হবে। মানুষকে বাচাতে হলে অর্থনীতির অগ্রযাত্রার কোন বিকল্প নেই। ভেবে দেখুন, ভাইরাস হয়তো আপনার আমার জীবন কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু অর্থনীতি ১৭ কোটি মানবকে ধ্বংশ করে দিতে পারে। তাছাড়া আমি আপনিতো-অন্যকারনেও মারা যেতে পারি। এই জন্য শুধুই নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে সকলকে সহ দেশকে বাঁচাই, সবাই সচেতন হই, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলি।

লেখক: পুলিশ পরিদর্শক
পরশুরাম মডেল থানা, ফেনী।

লেখাটি পাঠিয়েছেন- আমাদের প্রতিনিধি ছৈয়দ কামাল।

পাঠক কলামের কোন লেখার বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোন দায় নিবে না। লেখক তার নিজের লেখার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করবেন।
 

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন