আলো আসবেই: মেনে চলুন স্বাস্থ্য বিধি

আদিল মাহমুদ | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: রবিবার, ৩ মে ২০২০ | ০৭:৫৩:৫৫ পিএম
আলো আসবেই: মেনে চলুন স্বাস্থ্য বিধি
বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। বিশ্বের ২১০ দেশ ইতিমধ্যেই প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষের। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মৃত্যু হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি। মৃত্যুর এই মিছিল দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু মাত্রায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছে। এই অবস্থার মধ্যেই যে যার অবস্থান থেকে আমরা করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছি।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে আগেই মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আর বাংলাদেশকেও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। যদিও রাজধানী ঢাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দু'টিই বেশি। কিন্তু শুধু যে ঢাকায় এই ভাইরাস বিস্তার লাভ করেছে তা নয়, দেশের ৬৩ জেলায়। তবে আশার কথাও আছে। এরই মধ্যে করোনার জন্য দুইটি কোম্পানি অলরেডি ওষুধ তৈরি করছে। দেশে সহজ লভ্য এবং সস্তায় কয়েকটি আইসোলেটর ও ভেন্টিলেটরও তৈরি হচ্ছে- যা আগে আমরা কোনোদিন কল্পনাও করিনি।

কোভিড নিয়ন্ত্রণ জাতীয় অস্তিত্বের বিষয়। তাই মানুষের জীবন বাঁচাতে দ্রুত দৃঢ় ও সমন্বিত নীতিই পারে এই মহামারী থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মহামারী মোকাবেলায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন যা প্রশংসনীয় নেতৃত্বের পরিচয়।

যদিও পরিস্থিতি বলছে, করোনা দুযোর্গের নানামুখি প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং এই লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।তাই এই প্রতিকূলতা মোকাবেলায় শিক্ষা-গবেষণার প্রায় সব শাখার সম্মিলিত প্রয়াস চলছে বিশ্বজুড়ে। সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। গবেষকরাও করোনা ঠেকাতে সামাজিক দূরত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।

একটি উদারহণ এখানে প্রাসঙ্গিক। তা হলো, যানবাহনের পেছনে আমরা প্রায়ই একটা বাক্য লেখা থাকতে দেখি, ‘১০০ হাত দূরে থাকুন’। মাঝেমধ্যে আমরা রাগের বশেই হোক বা মজা করেই হোক, একে অন্যকে বলি,‘দূরে গিয়া মর!’ এসবের মূলকথাই হলো ‘দূরত্ব বজায় রাখুন’।

হ্যাঁ, দূরত্ব বজায় রাখুন, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। এতে সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করে। এ ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে ছয় ফুট বা প্রায় দুই মিটারের ব্যবধান বজায় রাখুন।

আর একটি উদাহরণ না নিয়ে এলে হচ্ছেই না। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অভিনব সাফল্য পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। চীন সীমান্তঘেঁষা দেশটি ঘোষণা করেছে, দেশে যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। প্রায় ৯ কোটির ওপর জনসংখ্যার ওই দেশটিতে করোনাভাইরাস রোগী পাওয়া গেছে ২৭০ জন, এর মধ্যে একজনও মারা যায়নি। বিশ্বে প্রতি মিলিয়নে আক্রান্তের সংখ্যা এ দেশেই সবচেয়ে কম। দেশটির প্রধানমন্ত্রী তারপরও জনগণকে সজাগ থাকতে বলেছেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সব রোগীকে সুস্থ্য করে তোলায় ভিয়েতনামের চিকিৎসকদের ভূয়সী প্রশংসা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।

হু এর কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটি বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায়েই তা মোকাবেলায় দেশটির সরকারের নেওয়া নানা জরুরি পদক্ষেপ বেশ ভালোভাবে কাজ করেছে বলেই এমনটি সম্ভব হয়েছে। দেশটির প্রতিবেশী চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোয় করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃতের সংখ্যা চিকিৎসক, সাধারণ মানুষ ও সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কীভাবে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে রেখেছে এবং আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যু শূন্যের কোঠায় ধরে রেখেছে–সেই রহস্য তুলে ধরেছে নিউইয়র্ক টাইমস।

ভিয়েতনাম সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ ও রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করার যে কর্মসূচি বহুদিন ধরে চর্চা করে আসছে করোনা প্রতিরোধে সেটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আর কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ভিয়েতনাম পুরো দেশটাই লকডাউন করে দিয়েছিল।এতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়েছে।

চীনের উহান থেকে ফেরা ৬৬ বছর বয়সী এক ভিয়েতনামি প্রথম করোনা ভাইরাসে শনাক্ত হন।আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ জানুয়ারি প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের খবর প্রকাশ করে ভিয়েতনাম সরকার। ওই দিন থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ জনে।এর মধ্যে দুজন চীনা নাগরিক ছাড়া বাকি সবাই ভিয়েতনামি।ব্যাপক আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তখনই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। পাশাপাশি করোনা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।কীভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে,কী করলে সুস্থ্য থাকবে, এটাই ছিল প্রচারের মূল্য বক্তব্য। এসবের পাশাপাশি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে পরীক্ষা করেছে। তবে গত ২ মার্চ সর্বনাশটা ঘটায় দেশটির একজন প্রভাবশালী নারী ব্যবসায়ী। ইউরোপের তিন দেশ ঘুরে ওই ব্যবসায়ী ভিয়েতনামের হ্যানয় বিমানবন্দরের দায়িত্বরত কর্মচারীদের দ্বারা পরিচালিত করোনা পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়েন দেশে।

বিমানবন্দরের পরীক্ষায় ফাঁকি দিলেও ভিয়েতনামের পুলিশ তাকে ঠিকই আটক করে। এর পর জানা যায়,তিনি করোনায় আক্রান্ত। এর পর ভিয়েতনাম সরকার একটা বড় পদক্ষেপ নেয়।সেটি হলো– ওই নারী যে বিমানে এসেছিলেন, তার সব যাত্রীকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।

তিনি যে রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই রাস্তা জীবাণুমুক্ত করা হয়, সেই পথের ধারে বসবাস করা প্রত্যেককে পরীক্ষা করা হয়। ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করে, যদি ইউরোপফেরত নারী বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফাঁকি না দিতেন, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা এত বাড়ত না। তবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের তুলনায় ভিয়েতনাম এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবেলায় যা করেছে, তা পুরো বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ইউরোপ থেকে এশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমেরিকা- সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে করোনা। অতীতে কোনো বিশ্বযুদ্ধও সাধারণ মানুষকে এত উদ্বিগ্ন বা ভাবিয়ে তুলেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে! অথচ তিন মাসেরও কম সময়ে দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বিস্তার করে মানুষকে কাবু করে ফেলেছে করোনা। যে দেশেই ঢুকছে সে দেশকেই নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। ইরানের অবস্থাও বেশ খারাপ। কাবু করে ফেলেছে স্পেন, ইতালির মতো দেশকেও। ফ্রান্সেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। এশিয়ার অন্য দেশে আগেই হানা দিয়েছে। অন্য দেশে তীব্রতা এখন না থাকলেও বাংলাদেশ-ভারতে জানান দিতে শুরু করেছে চলতি মাসের শুরু থেকে। 

এ অবস্থায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করেন। আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। 

সুতরাং করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার হাতিয়ার হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এ যুদ্ধে জয় আমাদের হবেই-আঁধার ঘোর কেটে আলো আসবেই।


লেখক: ওসি (তদন্ত)
পরশুরাম মডেল থানা, ফেনী।

লেখাটি পাঠিয়েছেন আমাদের ছাগলনাইয়া প্রতিনিধি ছৈয়দ কামাল।

পাঠক কলামের কোন লেখার বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোন দায় নিবে না। লেখক তার নিজের লেখার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করবেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন