শ্রমিকের আবার জাত থাকে নাকি

মো. রবিউল ইসলাম | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ মে ২০২০ | ০৮:৫৬:৪৫ পিএম
শ্রমিকের আবার জাত থাকে নাকি
১. আমাদের লাভ হলো কী? কার্যত কিছুই হলো না। আমরা শ্রমিক। জাত শ্রমিক। আমরা যেমন সৃষ্টিকর্তার গোলাম। তেমনি কিছু মানুষ-প্রতিষ্ঠানেরও। শ্রমিকের আবার জাত থাকে? হ্যাঁ আমাদের আছে। আমরা কর্মতৎপর। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পারি। সইতে পারি অসহ্য নির্যাতন, দুঃখ-বেদনা। বেতন পাই না মাসের পর মাস। অনেক সময় চাইতেও পারি না। এটি মালিকদের পছন্দও নয়। তারা খুশি হলে দেবেন। না হলে দেবেন না। তবে ৮ ঘণ্টার জায়গায় ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। শতভাগ উজাড় করে দিতে হবে।

আমরা চাপাবাজি জানি না। করলেও তা খাটে না। কারণ আমরা কাজটা করতে পারি। এর চর্চাই করে এসেছি। এখনো করি। সেটিই করে যাব। চাপাবাজি আমাদের নয়, ওগুলো বসদের কাজ। তাদের বেতন বেশি। বড় দায়িত্ব। চাকরিটা চলে যাওয়ার ভয়টাও বেশি। তাই বাগাড়ম্বর একটু বেশিই থাকতে হয়।

২. এখন সবকিছু এলোমেলো। সুন্দরের বিপরীতে অবস্থান। নিকষ কালো পৃথিবী। পত্রপল্লাব শোভিত ধরণী আজ থমকে আছে। বাতাসে লাশের গন্ধ। করোনা আমাদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। রক্তের বাঁধন ছিন্ন করছে। মুহূর্তেই মুছে ফেলছে ভালোবাসার বাঁধ। দুর্যোগে সৃষ্টিকর্তাকে বেশি মনে পড়ে। আজও পড়ছে। কিন্তু এ দুর্যোগ একদিন থাকবে না। পাখিরা উড়বে। এ ফুল ও ফুলে বসবে। গাইবে কুহু কুহু কত গান। নতুনে সাজবে পৃথিবী। রংধনুর রং আবারও আছড়ে পড়বে। কবিতা হেসে উঠবে অব্যক্ত হৃদয়ে। হয়তো সেদিন সৃষ্টিকর্তাকেও অনেকটা ভুলে যাব। যেমনটি ভুলে ছিলাম করোনার আগে।

৩. আমরা শ্রমিক শ্রমিকই থেকে যাব? সেটা থাক। দোষের কিছু নেই। সবাই মালিক হতে পারে না। তবে ন্যায্য পাওনা চাই। কবে থেকে সঠিক সময়ে সেই ন্যায্য পাওনা পাব? কবে থেকে আইন নির্ধারিত কর্মঘণ্টা পাব? বেশি সময় কাজ করলে তার মজুরি পাব? সাধারণ ছুটিসহ অন্যান্য সুবিধা কবে থেকে পাব? কবে থেকে নির্ভয়ে সংগঠন করার অধিকার, অফিসে নিজ ও কাজের নিরাপত্তা পাব, কবে থেকে আমরা ঝুঁকিভাতার আউতায় আসব? কবে আমাদের শ্রমিক নয়, মানুষ মনে করা হবে? কবে থেকে এ শ্রমিকদের ‘ব্যবহার’বন্ধ হবে? জানি না, এর কোনো জবাব কারও জানা আছে কিনা।

এখন ডিজিটাল যুগ। অফিস ছুটি দেওয়া হ। কিন্তু আমাদের-শ্রমিকদের মোবাইল ফোনে মেসেজ দেওয়া হয়। অফিসে আসো। কাজ করো। না হলে চাকরি শেষ। বেতনও শেষ। এটিও বন্ধ করতে হবে। গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। অপরদিকে শ্রমিকদের বলা হবে অফিসে যাও। কাজ করো। না হলে চাকরি থাকবে না। এমন দ্বিমুখী আচরণও কিন্তু বন্ধ করতে হবে।

৪. আজ পহেলা মে। মহান মে দিবস। এদিন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন। বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে রক্ত ঝরিয়েছিলাম। কিন্তু সেই রক্তক্ষরণ আজও থামেনি। নানা চেহারায় এ রক্ত ঝরছে। নানান প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।

৫. ১৮৮৬ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ন্যায্য মজুরি আর দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। কিন্তু আন্দোলনরত শ্রমিকদের দমাতে মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় পুলিশ। ১১ শ্রমিক নিহত হন। আহত ও গ্রেফতার হন আরও বহু শ্রমিক। পরে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এতে বিক্ষোভ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে পহেলা মে বিশ্বব্যাপী ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই এ দিবসটি আসে। আবার চলে যায়; কিন্তু শ্রমিকের নীরব কান্না থামে না। নির্যাতন থামে না। ন্যায্য মজুরিও মেলে না। অথচ এ দিবসটি ঘিরে আমাদের থাকে আকাশসম আয়োজন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

পাঠক কলামের কোন লেখার বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোন দায় নিবে না। লেখক তার নিজের লেখার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করবেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন