খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি: তারাকান্দায় হতদরিদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে এ কোন খাদকের ভয়াল থাবা!

ফজলে এলাহি ঢালী | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:৩৯:৩৭ পিএম
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি: তারাকান্দায় হতদরিদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে এ কোন খাদকের ভয়াল থাবা!
বৈশ্বিক করোনা মহামারীর এই সময়ে এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ কর্মসূচি চলমান। হতদরিদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে এ কোন খাদকের ভয়াল থাবা প্রশ্ন তারাকান্দা বাসির। শুরু থেকে শেষ অবধি বিতরণের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয় তাতে কি আছে শুভঙ্করের ফাঁকি?

মানুষের প্রথম ও প্রধান মৌলিক অধিকার খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাদার অফ হিউম্যানিটি বলে সারাবিশ্বে খ্যাতি অর্জনকারী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প ফেয়ারপ্রাইজের যে ১০ টাকা কেজি দরের খাদ্য কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। এই কর্মসূচির মূল প্রতিপাদ্য হলো "ক্ষুধায় এখন ভয় নাই, দশ টাকায় চাল পাই।" কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করতে ইউনিয়নের লোকসংখ্যা অনুযায়ী ওয়ার্ড ভিত্তিক ডিলার নিয়োগ করা আছে। নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী তারা সরকারি গোদাম হতে বরাদ্দকৃত চাল উত্তোলন করে সুবিধাভোগীদের মাঝে ১০ টাকা কেজিতে বিতরণ করে থাকেন। এ জন্য ডিলারদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন প্রদান করা হয়। ডিলার নিয়োগ থেকে শুরু করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে
ক. ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার ভিতরে হয় না,নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ডিলারের সাথে আলাপ করে জানা যায়, নিয়োগের সময় উচ্চ মহলের অনেক কে বেশ ম্যানেজ করতে হয়, দলীয় বিবেচনায় এবং আত্মীয় বিবেচনায়ও অনেককে ডিলারি প্রদান করা হয়। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি এখানে অনেকটা গৌণ বিষয় বলে প্রতিয়মান।

খ. সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুতির সময় সঠিক নিয়মকানুন বা নীতিমালা মানা হয়না। সুপারিশ ও আত্মীয়করণের কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, আমলা, কিছু ক্ষেত্রে অর্থের সুবিধা লাভের চেষ্টা মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও সুবিধাভোগী নির্ধারণের জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি থাকে, যেখানে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী অফিসার, জনপ্রতিনিধি, খাদ্য কর্মকর্তা, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার সহ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ববৃন্দের সমন্বয়ে তা গঠিত হয়। হতদরিদ্র ময় ব্যক্তিজীবনের স্বাবলম্বী নেতারা তাদের বরাদ্দকৃত কার্ডের মালগুলো ডিলারের কাছে বা গরীবদের কাছে অথবা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে সরকারের ক্ষতি হলেও এ কাজের সাথে জড়িত সবাই কিছু না কিছু লাভ পেয়ে থাকে। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারনে কড়াকড়ি আরোপ থাকায় এ কার্ডের চাউলগুলো নিয়েই সবাই বিপাকে পড়েছেন। আগে তা খাদ্য গোদামে রাখা যেতো বা মিলারদের দেওয়া যেতো পূর্ণ বিক্রির জন্য অথবা চাউল ব্যবসায়ীদের নিকট  বিক্রি করা যেতো, তারাও পূণরায় তা সরকার বা পাবলিকের নিকট বিক্রি করতো। অনেকটাই রি-সাইকেল প্রক্রিয়ায়।

গ. কার্ডধারি-দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুবিধাভোগীর কার্ডগুলো ডিলারগণ নিজের কাছে রেখে দেওয়ার জন্য, কে কে সুবিধাভোগী তা নিশ্চিত হতে পারা যায় না। এ ক্ষেত্রে ট্যাগ অফিসাররা তাদের নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। বিনিময়ে কিছুটা সুবিধা তারাও নেন এবং মাস্টাররোল ভুয়া বা বানানো হলেও তাতে সহি-সাক্ষর করে দেন।

ঘ. এমতাবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলেও পুনরায় প্রশাসন কর্তৃক সুবিধাভোগীর কার্ডগুলোর যাচাই-বাছাই না করা এবং একই ব্যক্তিকে বারবার অনুদান প্রদানের কারণেই ব্যাপক দূর্নীতির সুযোগ থেকে যায়। আর তালিকাটি জনসম্মুখে কখনো আলোরমুখ দেখে না ডিলার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। সর্বোপরি নীতিনৈতিকতার অভাব ও অধিক মুনাফা লাভের আশায় কালোবাজারি করে দেশের সম্পদ হতদরিদ্র মানুষের হক ছিনতাই করার মানসিকতাই কারসাজিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে ডিলার ও অবৈধ কার্ডধারীদের। ত্রাণ নিয়ে, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো দেশের সম্পদ লুন্ঠনের একটা প্রতিযোগীতা! যে দেশ ও জনগণের উপকারের জন্য তারা সব ভোটের সময় নির্বাচিত হয়, পাশ করার পর তারা তা বেমালুম ভুলে যায়, এক্ষেত্রে তাদের লোভ যেন সীমাহীন ও তাকে ভুলে গেছে। ভোটের সময় তারা যে ইনভেস্ট করে, তা তুলতে তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে এবং সে টাকা সুদে-আসলে তা পূরণ করতে চায়। আর এই বিষয়টির জন্য জনগণও কম দায়ী নয়, তারা সৎ, যোগ্য, আদর্শ দেশপ্রেমিক প্রার্থীদের অবজ্ঞা করে কালোটাকার মালিক, পেশিশক্তি অদক্ষ, দুর্নীতিবাজদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এর ফলে প্রসারিত হয় দুর্নীতির উন্মুক্ত হস্ত, পরবর্তীতে সুবিধাভোগীরা সঠিক সেবা থেকে সদা সর্বদাই বঞ্চিত হয়। এ ধরনের মানসিকতা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতে হবে। না হয় কখনো সুফল পাবেনা হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী। তবে সকল প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ তাও আবার নয়। প্রশ্নবিদ্ধরা  সংখ্যায় অধিক হবে না, তা না হলে দেশ এতোটা এগিয়ে যেতো না। বিশেষ করে দলীয় প্রধানের সততার কারণেই এ সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সঠিকতর নেতৃত্বগুণের বিকল্প নেই। ধান ভানতে শিবের গীত অনেক হলো, "শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ" এটাই হোক এ কর্মসূচির মূলমন্ত্র।

অনেকেই বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আজ অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী তারা চাউলের জন্য হুন্যে হয়ে ঘুরছে, এর কাছে তার কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। আজ করোনার ভয়ের চেয়ে ক্ষুধাতুর মুখগুলো কেমন যেনো ফ্যাকাশে, উচ্চবিত্তরা যেভাবেই হোক উচ্চমূল্যে পণ্যক্রয় করতে পারছে, নিম্নবিত্তরা দান, ত্রাণ নিয়ে  কোনক্রমে বেঁচেই আছে, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তরা পড়েছে একটা বেকায়দায়, তারা না পারছে হাতপাততে, না পারছে ক্ষুধার যাতনা সহ্য করতে, তাদের প্রতি এখন সরকারের এবং দানশীল ব্যক্তিদের একটু নজর দেওয়া এমুহূর্তে দরকার। "মানুষ, মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু!" প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই তাদের সবার অনুরোধে তারাকান্দা উপজেলার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারগণের তালিকা কষ্ট করে খুঁজে বের করে দেওয়া হলো। সেই সাথে এ প্রান্তিকের খাদ্য বরাদ্দ, উত্তোলন, সুবিধাভোগীর সংখ্যা দেওয়া হলো।

তারাকান্দা উপজেলায় সর্বমোট বরাদ্দ থাকে ৬৩২.৭০০মেঃটন। ডিলারগণ শ্যামগঞ্জ খাদ্যগোদাম হতে উত্তোলন করেন ১৪৩.০৭০ মেঃটন। তারাকান্দা খাদ্যগোদাম হতে উত্তোলন করেন ৪৮৯.৬৩০ মেঃটন। যা ৩০ এপ্রিল/২০২০ তারিখে বিতরণ করে শেষ করার কথা। এই উপজেলায় মোট ডিলারের সংখ্যা ৩৮ জন। তাদের মধ্যে তারাকান্দা গোদাম হতে ২৯জন চাউল উত্তোলন করেছেন, শ্যামগঞ্জ থেকে ৯ জন উত্তোলন করেছেন।

তারাকান্দা উপজেলা ইউনিয়ন ভিত্তিক ডিলার ও কার্ডধারীর সংখ্যা নিন্মে উল্লেখ করা হলো: তারাকান্দায় ৫-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী-২৫৭৮জন, বানিহালায় ৩-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী- ১৮৫০জন, কাকনীতে ৪-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী-১৯৯০ জন, গালাগাঁওয়ে ৪-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ড ধারী-২২৬০জন, বালিখা ইউনিয়নে ৪-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী-২১৪৪ জন, ঢাকুয়া ইউনিয়নে ৩-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী-১৮৭২ জন,রামপুর ইউনিয়নে ৩-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী ১৮৮৫জন, কামারিয়া ইউনিয়নে চারজন ডলারের বিপরীতে কার্ডধারী-২২২৫ জন, কামারগাঁও ইউনিয়নে ৩-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ড ধারী-১৭৭৬ জন, বিসকা ইউনিয়নে ৫-জন ডিলারের বিপরীতে কার্ডধারী- ২৫৪৪ জন।

সরকারের ফেয়ারপ্রাইজের ১০ টাকা কেজি দরের সর্বমোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা -২১০৯০ জন।

অবিলম্বে শুভঙ্করের ফাঁকি প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে প্রশাসন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পুনর্বিবেচনা করবেন নতুন করে সুবিধাভোগী নির্বাচনের দাবি তারাকান্দা উপজেলাবাসীর।

এ বিষয়ে তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নতুন করে সুবিধাভোগী নির্বাচনের এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তা প্রকাশের উদ্যোগ নিবেন।

লেখক: সাংবাদিক

পাঠক কলামের কোন লেখার বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোন দায় নিবে না। লেখক তার নিজের লেখার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করবেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন