পেটের ক্ষুধায় লকডাউন ভেঙ্গে ঘরের বাইরে আসছে নিম্ন আয়ের মানুষ

ফরিদ উদ্দিন বিপু,কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি | সারাদেশ
প্রকাশিত: বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:৫১:৩৩ পিএম
পেটের ক্ষুধায় লকডাউন ভেঙ্গে ঘরের বাইরে আসছে নিম্ন আয়ের মানুষ
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় করোনা সংক্রমন এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ঘোষিত লকডাউনে বিপাকে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা। সরকারের দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের দেয়া ৪৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২লক্ষ টাকার খাদ্য সহায়তা অন্তত: ৫০ হাজার দরিদ্র মানুষের জন্য অপ্রতুল। আর পেটের ক্ষুধায় লক ডাউন ভেঙ্গে শ্রম বিক্রী করে উপার্জনের জন্য এতে ভেঙ্গে পড়ছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় সরকারের নেয়া উদ্যোগ।
 
এছাড়া বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ক্ষুদ্র দরিদ্রদের মাঝে ঋন কার্যক্রম পরিচালনা করে লভ্যাংশ নিলেও এমন দূর্দিনে পাশে নেই তারা। নির্বাচনের সময় দরিদ্রদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করা রাজনৈতিক নেতারাও এখন পাশে নেই। সামাজিক দু’চারটি সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্দোগে সামান্য কিছু খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে দরিদ্রদের। তাও প্রশাসনের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমন্বয় ছিলনা। এমনকি একটি সাবান, টিস্যু বিতরন করেছে ১০/১২ জনে মিলে। সুযোগ পেলে কিশোরী-নারীর হাতও ধরেছে এদের দু’একজন। তবে  আশার কথা হচ্ছে দিন এনে দিন খাওয়া প্রায় ২০ হাজার মানুষের খাদ্য সহায়তার জন্য দূর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয়ে চাহিদা প্রেরন করা হয়েছে। যা বরাদ্দ পেলেই বিতরন করার কথা বলছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র।

জানা যায়, আড়াই লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ উপজেলায় অন্তত: ৫০ হাজার মানুষ রয়েছে হতদরিদ্র। যারা দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে বলছে উপজেলা পরিসংখ্যান অফিস সূত্র। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় ও চলমান লকডাউনে ঘরে থাকায় কর্ম বিমূখ হয়ে পড়েছে এ বৃহৎ গোষ্ঠীর মানুষ। যাদের অধিকাংশের ঘরেই কোন খাবার নেই। এরমধ্যেও সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় দেয়া ভিজিডি, ভিজিএফ, টিসিবি, ওএমএস, ফেয়ার প্রাইস চাল বিতরনে অস্বচ্ছতা ও দূর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে সরকার ঘোষিত সামাজিক দূরত্ব রক্ষা ও ঘরে থাকা হয়ে উঠছেনা নিম্ন আয়ের মানুষের।

পেটের ক্ষুধা উপার্জনের জন্য তাদের বের করছে ঘরের বাইরে। ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দিনমজুর, রিক্সা চালক, ভ্যান চালক, পরিবহন শ্রমিক, রেষ্ট্রুরেন্ট শ্রমিক, ফেরী ওয়ালা ও চায়ের দোকানদার পরিচালিত পরিবার গুলো খাদ্য সংকটে পড়েছে। তাই গোপনে কাজের জন্য বেরোচ্ছে এরা। শ্রম বিক্রী করে উপার্জিত টাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো পেট পুড়ে ক্ষেতে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার শহর, বন্দর, গ্রামীন জনপদে চলছে ইমরাত শ্রমিকদের কাজ। শহরে, হাট-বাজারে চাকা ঘুরছে অটো, রিক্সা-ভ্যানের। মাটি কাটা, বালু কাটার কাজও থেমে নেই। চায়ের দোকান গুলোও চলছে গোপনে প্রকাশ্যে। অপ্রতুল খাদ্য সহায়তা বিতরনে দেখা গেছে দরিদ্রদের ভিড়। টিসিবি, ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, ফেয়ার প্রাইস’র চাল বিতরনেও দেখা গেছে গায়ে ঠাসা ঠাসি করে দাড়িয়ে থাকা মানুষের অপেক্ষা। এমনকি অসচেতন মানুষের মত সচেতন মানুষ, রাজনীতীক ও জনপ্রতিনিধিরাও মানছেনা ৩ফুট দূরত্ব রক্ষার নির্দেশনা। এতে ভেঙ্গে পড়েছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার উদ্যোগ।

বুধবার উপজেলার ধূলাসার ইউপি চেয়ারম্যান আ: জলিল মাষ্টার অর্ধশত দিনমজুরদের সমাগম করে তার ব্যক্তিগত পুকুর কাটার কাজ করতে শুরু করে। এতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার নির্দেশনা ভেঙ্গে পড়ায় স্থানীয় বয়স্ক নাগরিক আজাহার খলিফা কাজ বন্ধ করতে নিষেধ করার পরও জনসমাগম চলতে থাকায় ইউএনও কে ফোন করে জানান তিনি। এরপরও চেয়ারম্যান অর্ধশত শ্রমিকদের নিয়ে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করেনি। এছাড়া পৌরশহরের রহমতপুর এলাকা সহ বেশ ক’টি আবাসিক এলাকায় চলছে ইমারত নির্মানের কাজ। অসচেতন বাড়ী ওয়ালা ও ক্ষুধার্ত শ্রমিক কেউ বন্ধ করছেনা কাজ।

এদিকে উপজেলা থেকে মোট আট জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা আইইডিসিআর এ প্রেরন করা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। যার অদ্যদিন পর্যন্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র। উপজেলায় এখনও ৯জন হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন মোট ৯৮ জন। বুধবার আরও এক জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য প্রেরন করা হয়েছে। যা নিয়ে মোট ৯জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হাওলাদার।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ বলেন, ’করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দূর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয় থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ইতোপূর্বে ৪৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ দু’লক্ষ টাকা পাওয়া গেছে। যা দিয়ে দুই হাজার নিম্ন আয়ের পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।’

তপন কুমার ঘোষ আরও বলেন, ’উপজেলার দু’টি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নের ১৯০৫২ জন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের তালিকা তৈরী করে উর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হয়েছে বরাদ্দের জন্য। আজ জেলা সদর থেকে ১২টি ইউনিয়নের কর্মবিমূখ হয়ে পড়া মানুষের জন্য ৩৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১লক্ষ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যা দিয়ে আরও কিছু পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়া যাবে।’

ইউএনও আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, ’সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। পুলিশ, আনসার ব্যাটালিয়ান, সেনা সদস্যরা এক যোগে কাজ করছে। শহর, বন্দর ও গ্রামের হাট বাজার গুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জনসমাগম রোধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতির অবস্থান নিয়েছি।’

বাংলাপত্রিকা/এনএন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন