এই ভুবনে বিদায়ী মানুষের ঠাঁই নেই

মো: রেদওয়ানুল হক মিলন | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শনিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ | ০৮:৫৮:২৫ পিএম
এই ভুবনে বিদায়ী মানুষের ঠাঁই নেই
কোন একদিন জল-জোছনার শহর ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলা আকচা গ্রামে ছায়াসুনিবিড় বাড়িতে বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান হিসেবে আমি জন্মেছিলাম। ছবির মতো সাজানো গ্রামীণ শহরের চারপাশজুড়ে সবুজ শ্যামল। গ্রামের বুক চিরে বইছে টাঙ্গন। হিমালয়ের পাদদেশে শুয়ে থাকা ঠাকুরগাঁয়ের বাড়িতে আমাদের তিন ভাইবোনের সংসার ছিল আনন্দের। সংসারে টানাপড়েন ছিল। কিন্তু উপচে পড়া সুখও ছিল।

পারিবারিকভাবে জম্মের পর থেকে মা-বাবা ও বড় ভাই-বোনদের কোরআন তিলাওয়াতে ঘুম ভেঙেছে। মাগরিবের নামাজ পড়ে পড়তে বসা সেই ছেলেবেলার অভ্যাস ছিল। মহান আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আনুগত্যে কখনো আমার মনে দ্বিধা আসেনি। জম্মসূত্রেই নয়, বিশ্বাসেও আমি একজন মুসলমান। কিন্তু শৈশব থেকে পরিবার, সমাজ আমাকে সব ধর্মের বন্ধু-বান্ধব প্রিয়জনদের সাথে আত্মিক বন্ধনে বেড়ে উঠতে শিখিয়েছে। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে জাতপাতের নামে মানুষকে শোষণ-নিপীড়ন বা হত্যার আমি বিরোধী।

এই ছোট্ট জীবনে কখনো কার সাথে ধর্মীয় কারণে ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য বা বিরোধ যেমন হয়নি তেমনি আর হবেও না। বরং আত্মীয়স্বজন থেকে নিজ ধর্মের অনেকের সাথে আমার বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ হয়েছে। মনোমালিন্য হয়েছে। আমি ধর্মে বিশ্বাসী মুসলমান হলেও কোনো দিন কোনো ধর্মের প্রতি কটাক্ষ যেমন করিনি, তেমনি কোনো ধর্মের প্রতি অসম্মানও করিনি। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার হীনমন্যতায় কখনো আমি ভুগিনি। বরং ধর্মান্ধ অনেক আত্মীয়স্বজনের সাথে বিভিন্ন  কারণে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অকালে মা,বাবা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। আমরা তিন ভাইবোন বেঁচে আছি।

শৈশবে ভীষণ চঞ্চল ছিলাম। যখন হাঁটা শিখেছি কোনো পুকুর, খাল-বিলে ডুবে না মরি তাই বাবা কোমরে ঘুঙুর বেঁধে দিয়েছিলেন। কৈশোরে ছিলাম দুরন্ত ডানপিটে। পরিবার, স্কুল, পাড়াপড়শি সবাইকে জ্বালিয়ে মেরেছি। আমাদের সময় ছেলেবেলায় শুধু পরিবারের অভিভাবকরাই স্নেহ শাসনে রাখতেন না। পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজন ও সামাজিক অভিভাবকদের ছায়াও ছিল কঠোর। মুরুব্বিদের প্রতি সম্মান ও ভয় ছিল সীমাহীন। অতীতের কথা মনে হলে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। সাদাকালো ১০বছর আগের সময়টা আমাকে গভীরভাবে টানে। এখনো মুষলধারে বৃষ্টি নামে বর্ষায় আমাদের শহরে। হিমালয়ের কোলে শুয়ে থাকা ঠাকুরগাঁওয়ের বৃষ্টি এখনো মুগ্ধ করে। গ্রামের ধূলিকণা গায়ে মাখা পথে কত রাত জোছনায় ভিজতে ভিজতে ঘরে ফিরেছি। গানের সুরে লালিত কবির কোমল হৃদয় নিয়ে শহর আমাকে বড় করে তুলেছে। প্রেমের শহর, গানের শহর, আড্ডার শহর ঠাকুরগাঁও।

সত্যই আমার কাছে বড় আর নিরপেক্ষতা আমার কাছে নির্বাসিত। মানবতাবাদী বিশ্বনন্দিত লেখক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার সব বেদনার শক্তির আশ্রয়। আর আমার ভিতরে বাস করা বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক বাংলাদেশ আদর্শের রাজনীতির বাতিঘর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সাহসের উৎস। অগণিত পাঠকের ভালোবাসা, আস্থা-বিশ্বাস আমার দায়বদ্ধতার জায়গা। আমার স্বভাব হলো কোথাও ভালোবাসা পেলে বার বার যাই। কেউ বিরক্ত হলে ভুলেও সেদিকে পা বাড়াই না। কাউকে পছন্দ না হলে তার দিকে ফিরেও তাকাই না। কৌশলী হওয়ার শব্দটি আমার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না।

অনেকে বলেন আবেগ আমার শত্রু। আমি বলি, আবেগ আমার শক্তি। আবেগ-অনুভূতিহীন, রসবোধ, আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বহীন মানুষকে আমার কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ মনে হয় না। প্রিয়জনদের ওপর মেজাজ করলেও তা সাময়িক। যেখানে ভালোবাসা সেখানেই আমার সংঘাত হয়। প্রেমহীন মানুষের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ হয় না। এবং সেই মেজাজ খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। বিষ পুষে রাখা আমার স্বভাবে নেই। আমারও কবির মতো একটি কোমল হৃদয় আছে। সেখানে অন্তহীন তৃষ্ণা, অতৃপ্তি ক্ষত ও দহন রয়েছে। মাঝে মাঝে আপস করে বেঁচে থাকার নীতি আমাকে ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত করে। প্রেমহীন মায়া-মমতাহীন, স্বার্থপর নষ্ট সমাজ আমাকে নিঃসঙ্গ করে দেয়।

আমি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সত্য সে যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম নীতিতে পথ হাঁটার চেষ্টা করি। আমি তাঁর যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে হৃদয়ের ডাক গ্রহণ করি।

মানুষের জীবনটা আসলেই অদ্ভুত। এ অদ্ভুত জীবনে আমাদের কত ধরনের লড়াই করে কাটাতে হয়। অনেক সময় আমরা সুখের জন্য লড়াই করে অসুখকে ডেকে আনি। মনের স্বস্তির জন্য অস্বস্তিকে আশ্রয় দিই। সুখ, স্বপ্ন ও বাস্তবতা আসলেই আলাদা। যশ, খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত কোনোটাই সুখ এনে দিতে পারে না। আর কোনো কিছুর স্থায়িত্বও দীর্ঘ সময় থাকে না।

মানুষের কষ্টের কোন শেষ নেই। বাদশা থেকে গরিব সবার ভিতরে আরেকটা মানুষ বাস করে। বাইরে থেকে একরকম হলেও মানুষের ভিতরে এরেকটা জগ থাকে। আসলেই জগৎ সংসার বড়ই অদ্ভুত। যেমন আমাদের বিশ্বনন্দিত কবিরা যে যার যার কষ্টগুলো নিজের মতো ব্যক্ত করে গেছে। আবার স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরওলাল নেহেরুর সুযোগ্য কন্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিদুষী নারী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নিজের দুঃখ কষ্টগুলো সব-সময় আড়াল করে রাখতেন। শুধু পুত্র সঞ্জিতের মৃত্যুর সময় হাসপাতালে ভেঙে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী। তবু মিডিয়া আর মানুষের সামনে তা প্রকাশ করেননি। শুধু নিজের চোখের অশ্রু আড়াল করতে চোখ মুছে কালো সান গ্লাসের আড়ালে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করেন। দুনিয়ার কঠোরতম মানুষের ভিতরে থেকে যায় অনেক অজানা কষ্ট। সেই বেদনার নীল রং কখনো সামনে আসে আবার কখনো আড়ালেই থেকে যায়। দুনিয়ার মানুষে মানুষের কাছে থেকে যায় শুধু তাদের কঠোরতমই।

মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। গর্বের কিছু নেই। চলে গেলে পার্থিব দুনিয়ার কিছুই আর থাকে না। মানুষ একাই আসে, একাই চলে যায়। সঙ্গে কেউই যায় না। কিছুই থাকে না। মৃত মানুষের নামাজে জানাজা কিংবা শোকের বাড়িতেও মানুষ ব্যস্ত থাকে নিজেদের আলোচনাতেই। কারণ, যিনি মারা গেছেন তিনি তখন সবার কাছেই লাশ। মানুষ আর নন। লাশকে দ্রুত দাফন করে সবাই ফিরতে চায় আপন আনন্দ ভুবনে। এই ভুবনে বিদায়ী মানুষের আর ঠাঁই থাকে না। কবি নাজিম হিকমত বলেছেন, মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। বাস্তবে এ আয়ু এখন মাসও পার হয় না। মানুষ ভুলে যায় সবকিছু। বর্তমান হয়ে যায় অতীত।

২০০০ সালে ৭ই ফেব্রুয়ারী মাত্র চার মাস বয়সে মাকে হারিয়েছি তাই ৭ই তারিখ বেদনাবিধুর শোকাবহ স্মৃতির দিন হিসাবে প্রতিবছরই পালন করি। ৭ই ফেব্রুয়ারী বেদনাবিধুর শোকাবহ দিনটি সামনে রেখে একই মাসে আরো তিন জন ভালোবাসার প্রিয় মানুষকে হারালাম। ভালো মানুষ বেশিদিন থাকেনা চলে যান। দুনিয়ার অশান্তি তাদের ভালো লাগেনা তাই তারা চলে যায়। প্রিয়জনদের মৃত্যু আমাকে কাঁদায়। মায়ের মৃত্যুর সময় আমার বয়স সবেমাত্র চার মাস হয়েছিলো তাই সেভাবে বলতে পারছিনা। তবে বাবা মৃত্যুর সময় পাশে ছিলাম তিনি কী যেন বলতে চেয়ে ছিলেন বলতে পারেননি। ডাক্তার এলেন ইনজেকশন দিলেন। তার পর বাবা চোখ বুজলেন।

বন্ধু মিমের কত আর বয়স হয়েছিলো? কেন তাকে হুট করে বিদায় নিতে হবে। ৪০ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন স্বপ্নবাজ, উন্নয়ন কর্মী, সমাজসেবক বড় ভাই শামসুল হক আরো কিছু দিন বেঁচে থাকলে মানুষটার কী সমস্যা হতো? ডাক পড়লে সবাইকে চলে যেতে হয়। আমরা কেউ থাকবো না। মানুষ কী শেষ বিদায়টা টের পায়?

সেদিন এক মৃত ব্যক্তির জানাযায় দাঁড়িয়ে একটি কথাই ভাবছিলাম মানুষের এতো কিছু করে কি লাভ কোন কিছুই তো সঙ্গে নিতে পারেনা। একটুরো সাদা কাফনের কাপড়ই সঙ্গে থাকে তার পরেও মানুষের এতো লড়াই। নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে গেলে সবাই অচেনা হয়ে যায়।

মানুষের দুখ-কষ্টের কথা আর লিখতে ভালো লাগেনা।

একটি গান আছে ......... তুমি আর নেই ... সেই তুমি... জানি না জানি কেন এমন হয়... আসলে কেন এমন হয়? এখনো মাঝে মাঝে ভোর রাতে আমার ঘুম ভাঙে বাবা কি যেন বলতে চেয়েছিলেন। বাবাকে স্বপ্নে দেখি তিনি আমার পাশে এসে দাড়ান। তারপর ডাকেন চল ঘুরে আসি। চল ঘুরে আসি বাবা...। মাঝে মাঝে অতীত আমাকে কাঁদায় ছোট ছোট ভুল গুলো আমাকে শেষ করে দেয়। কষ্টের দাহ তীব্রতর হয়ে তছনছ করে দেয়।

বড়ই অদ্ভুত এ জীবন আমার প্রথম মৃত্যুর খবর আমার মা তখন আমার বয়স মাত্র চার মাস। কিন্তু মৃত্যুর কষ্ট অনুভবের বয়স তখন আমার হয়নি। তখন হয়তো চেয়ে চেয়ে দেখেছিলাম আর ক্ষুধার যন্ত্রনায় ডুকরে ডুকরে কেদেছিলাম সবাই হয়তো ভেবেছিলো শিশুটি তার মায়ের জন্য কাঁদছে ...............

আমি জীবনের বড় সময় গুলোতে থেকেছি কষ্টের দাহনে। প্রিয়জকে হারানোর কষ্টগুলো আমাকে বিদ্ধ করে রাখে সবসময়। ছোট বেলা থেকেই কষ্টের সমুদ্রে সাতার কেটে বেড়ে ওঠা আমার। মাত্র চার মাস বয়সে মাকে হারিয়েছি আর ৮ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে আমি আজ দেশে হারা হয়ে গেছি। পরিবার সমাজ ভাইবোন আত্নীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে অনেক লিখেছি কিন্তু নিজের ভিতরের ছাইচাপা আগুন ভুলে যাই অতীতকে মনে করে। মানুষের এক জীবনে অনেক কাহিনী বেড়িয়ে আসে। স্বপ্নচারী মানুষও বুকভরা কষ্ট নিয়ে বাস করে। হ্নদয়ের অতলে লুকিয়ে থাকা সেই কষ্ট সহজে কাউকে জানান দিতে কারও ভালো লাগেনা।

এরপর ৮ বছর পর বাবাকে হারালাম যখন বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনলাম তখনো সেই কথাটির অর্থ ভালো করে বুঝতাম না। তবে সকালে বারান্দায় এসে দেখলাম বাবার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গনে খাটের উপর শয়ন। কিন্তু মৃত্যু যে কত ভয়ঙ্কর সে দেহ দেখে তার কোন প্রমান ছিলোনা। সেদিন ভরের ফর্সা আলোতে মৃত্যুর যে রূপ দেখেছিলাম তার সুখ-প্রান্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। তবে বাবাকে হারানোর পর শোকের নিবিড় অন্ধকার রূপ দেখতে পাই। আমি জীবনে প্রথম উপলব্ধি করি মৃত্যুশোকের তীব্র যন্ত্রনা। বাবার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো তিনি ছিলেন ছোটবেলার খেলার সঙ্গী আরো অনেক কিছু। বাবা মায়ের মৃত্যুর শোক সামলাতে আমাকে অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে। আমি তখনো জানতাম না আমার জন্য আরো অনেক মৃত্যু অপেক্ষা করছে। নিয়তির নিষ্ঠুরতা বলে কথা।

লেখক: মো: রেদওয়ানুল হক মিলন
সংবাদ কর্মী

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন