মহীয়সী নারী রওশন আরা হক যেন কক্সবাজারের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা

মোঃ শহীদুল্লাহ | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ০৯:৫২:১৩ পিএম
মহীয়সী নারী রওশন আরা হক যেন কক্সবাজারের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা
আমি আজ এমন একজন মহীয়সী নারীর কথা লিখছি যে নারী নিজ চারিত্রিক গুণে নিজেকে কক্সবাজারের আওয়ামীলীগ পরিবারের কাছে কক্সবাজার জেলার বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর ত্যাগের অনেক স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে আবেগময় কান্নার সৃষ্টি করে।  

আজ যারা কক্সবাজার জেলায় আওয়ামীলীগ পরিবারের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনে বিভিন্ন শাখা ইউনিটের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে আপনারা যারা তরুণ, ছাত্র, যুবকেরা আছেন আপনারা কি জানেন কক্সবাজারের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা কে হতে পারেন? আপনারা কি জানেন?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকাস্থ ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটিকে দেশের সকল মানুষের কাছে যেমন ৩২ নম্বর হিসাবেই পরিচিত। তেমনি ঢাকা ৩২ নম্বর বাড়িটির মত কক্সবাজার জেলা সদরেও একটি বাড়িকে আওয়ামীলীগ পরিবারের সদস্যরা ৩২ নম্বর হিসাবে চেনেন।

সে বাড়িটি আর কারো নয় কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের আমরন সভাপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, কক্সবাজার পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র (চেয়ারম্যান) মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মরহুম আলহাজ্ব একেএম মোজাম্মেল হক সাহেবের বর্তমান বাস ভবন হকশণকেই কক্সবাজারের ৩২ নম্বর বলা হয়।

জাতির জনকের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যেমন বঙ্গবন্ধুর গৌরবময় জীবনের বড় একটি অংশ। তেমনি কক্সবাজারের আওয়ামীলীগ রাজনীতির কিংবদন্তি মোজাম্মেল সাহেবের সহধর্মিণী রওশন আরা হকও মোজাম্মেল সাহেবের গৌরবময় জীবনের একটি অংশ।

জাতির জনকের নিজ হাতে লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটিতে বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের যে চারিত্রিক গুণাবলি সম্বলিত গৌরবান্বিত বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন। কক্সবাজারের ৩২ নম্বরের কর্ণধার মোজাম্মেল সাহেবের জীবনের আমার দেখা কিছু কিছু ঘটনা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন দর্শনের সাথে রওশন আরা হকের জীবনালেখ্য হুবুহু মিলে যায়।

বঙ্গবন্ধুর চরম দুঃসময়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুর পাশে ছায়ার মতই ছিলেন। প্রয়োজনের স্বার্থে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির জন্য নিজ থেকে সব কিছুই বিলিয়ে দিতেন। মোজাম্মেল সাহেবের সহধর্মিণী রওশন আরা হকও মোজাম্মেল সাহেবের কথায় দলীয় নেতা কর্মীদের স্বার্থে বিনাবাক্যে সব কিছু উজাড় করে দিতেন। রওশন আরা হক দলের নেতা কর্মীদের দুঃসময়ে যেভাবে নিজের একমাত্র আদরের কন্যার নামে সঞ্চিত টাকা এবং নিজের স্বর্ণালংকার মোজাম্মেল সাহেবের হাতে তুলে দিতেন।

সেই উদারতা পূর্ণ আমার দেখা অনেক ঘটনা গুলোর মধ্যে এখনো যে ঘটনা গুলো আমার বার বার মনে পড়ে। সেরকম দুয়েকটি ঘটনা আজ আমি পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরব।

১৯৮৬ কি ৮৭ সালের ঘটনা। সেই সময়ে সামরিক জান্তা এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে প্রার্থীর নেওয়া ব্যাংক ঋণের টাকা পরিশোধ করতে। নিজের গহনা বিক্রি করা এবং সেই নির্বাচনের দিনে সংঘটিত সংঘর্ষে গুরুতর আহত দলীয় নেতা কর্মীদের চিকিৎসার জন্য বড় মাটির ব্যাংকে নিজের একমাত্র কন্যা লুনার নামে সঞ্চিত টাকা তুলে দেওয়ার ঘটনা।

আমাদের কক্সবাজার জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান সাবেক সাংসদ মোশতাক আহমদ চৌধুরী সেই নির্বাচনে কক্সবাজার রামু আসন থেকে ১৫ দলের মনোনয়ন লাভ করেন। মনোনয়ন পত্র দাখিলের আগের দিন মোশতাক আহমদ চৌধুরী মোজাম্মেল সাহেবের বাসায় আসেন।

মোজাম্মেল সাহেব মোশতাক মিয়ার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাংকের কোন ঋণ খেলাপী আছে কিনা। মোশতাক আহমদ চৌধুরী মোজাম্মেল সাহেবকে বললেন, না সব ঋণ শোধ করে দেওয়া হয়েছে আর কোন প্রকার ঋণ নেই।

ঠিক সেই সময় কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার মোজাম্মেল সাহেবের বাসার টেলিফোনে ফোন করে বলেন, মোশতাক আহমদ চৌধুরীর নামে দুই লাখ টাকার উপরে খেলাপী ঋণের টাকা অনাদায়ী আছে। এই টাকা শোধ করা না হলে মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়ে যাবে।

তখন মোজাম্মেল সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, এই ঋণের কথা বলা হয়নি কেন? অপর প্রান্ত থেকে ম্যানেজারের বলা কথা মতে বুঝা যায় মোশতাক আহমদ চৌধুরীর মনোনয়ন পত্র যাতে বাতিল হয়ে যায় সেই জন্য এই খেলাপী ঋণের কথা গোপন রাখা হয়।

মোজাম্মেল সাহেব কথা শেষ করে মোশতাক আহমদ চৌধুরীকে বললেন, এই টাকাতো শোধ করতে হবে না হলে মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়ে যাবে। মোশতাক মিয়া বিভিন্ন জনের কাছে ফোন করে টাকা চাইলেন। কারো কাছে টাকা পেলেন না। তখন রাত প্রায় ১২ টার কাছাকাছি হবে।

মোজাম্মেল সাহেব টলিফোন নিয়ে কক্সবাজারের স্বর্ণের অন্যতম দোকান জিপি ধর জুয়েলার্সে ফোন করে বলেন বাড়ির স্বর্ণ গুলো নিয়ে যাও দুই লাখ টাকা নিয়ে এস। গঙ্গা মহাজন একজন লোক পাঠালেন দুই লাখ টাকা নিয়ে। লোকটি টাকা দিয়ে স্বর্ণ গুলো নিয়ে চলে গেলেন।

নিজের স্বর্ণ গুলো দিতে রওশন আরা হক কোন প্রকার টুঁশব্দ পর্যন্ত করেনি। পরে ঘটনা সেই নির্বাচনে কক্সবাজার পৌর এলাকার হাশেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করে দেয়। পরে স্থগিত ভোট কেন্দ্রের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী দিদার মিয়ার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হাশেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোট ছিঁড়তে শুরু করলে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা বাঁধা দিলেই তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়।

এই সংঘর্ষে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের উপর ব্যাপক হামলা করে। এই হামলায় অনেক নেতা কর্মী গুরুতর আহত হয়। মোজাম্মেল সাহেবের সহধর্মিণী রওশন আরা হকের বন্ধক রাখা স্বর্ণ গুলো বিক্রি করে পাওয়া টাকা এবং মোজাম্মেল সাহেবের একমাত্র কন্যা তাহমিনা হক চৌধুরী লুনার টাকা জমানোর একটি বড় মাটির ব্যাংক ভেঙে সমস্ত টাকা দিয়ে দেয় আঘাত পাওয়া নেতা কর্মীদের চিকিৎসার জন্য।

আমার জীবনে আমি মোজাম্মেল সাহেবের বাড়িতে এক যুগের কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাঁর বাসায় যে কোন নেতা কর্মীরা নিজেদের প্রয়োজনে গেলেও ভাত না খেয়ে আসতে দিতেন না মোজাম্মেল সাহেবের সহধর্মিণী রওশন আরা হক।

যে কোন সময় যে কোন অবস্থায় রওশন আরা হক বাসায় আসা নেতা কর্মীদের মনে আঘাত আসে এমন কথা বলতে দেখিনি। মোজাম্মেল সাহেব মানুষটি ছিলেন খুব রাগী। তাঁর স্ত্রী রওশন আরা হক ছিলেন শান্তশিষ্ট এক মহীয়সী নারী।  

আজকের ২৫ অক্টোবরের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। জানিনা তিনি সেখানে কোন অবস্থায় কেমন আছেন। আজ তাহার মৃত্যু দিবসে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ আমাদের কক্সবাজারের ৩২ নম্বরের মহীয়সী নারী মরহুম রওশন আরা হককে জান্নাত বাসী করুন আমিন।

লেখক: মোঃ শহীদুল্লাহ, সাংবাদিক

বাংলাপত্রিকা/এসআর

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন