র‍্যাগিং নামক অপসংস্কৃতি বন্ধ হওয়া সময়ের দাবি!

মোঃ ইমরান | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৫৫:৩৫ পিএম
র‍্যাগিং নামক অপসংস্কৃতি বন্ধ হওয়া সময়ের দাবি!
জ্ঞান সৃষ্টি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার তীর্থস্থান বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মনে অজানা আতঙ্কের নাম হয়ে দাড়ায় র‌্যাগিং, তখন মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ হয় সঙ্কুচিত।

দীর্ঘ বারো বছরের প্রতীক্ষা ও লালিত স্বপ্ন পূরণে অনেক আশা নিয়ে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু র‍্যাগিং নামক ব্যাধি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সে স্বপ্ন পূরণে। বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃষ্টি করবে নতুন জ্ঞান, যা হবে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞান চর্চার স্থান। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চার সে পথ আড়ষ্ট হয় র‍্যাগিংয়ের যাতাকলে। অপমৃত্যু ঘটে কিছু স্বপ্নের, সুন্দর আগমী ভবিষ্যতের।

উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করে একজন শিক্ষার্থী, তখন তার চোখে থাকে রঙিন স্বপ্ন, নিজের এবং দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। সে ছুটে চলে নতুন প্রত্যয়ে, নতুন উদ্যমে। যেখানে অজানাকে জানার, নিজের নিত্য সৃজনশীল ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দেয়ার থাকে সুবর্ণ সুযোগ, সে সুযোগটিই যেন লুফে নিতে চায় তৃষিত সত্তা।

কিন্তু হঠাৎ কোনো এক আচমকা ঝড় ধুলিস্মাৎ করে দেয় সবকিছু। রুদ্ধ হয়ে যায় সে স্বপ্ন পূরণের পথ। মরীচিকার এক অদৃশ্য আস্তরণে অন্তরাল যায় আকাশ ছোয়ার স্বপ্ন, সঙ্কুচিত হয় মুক্ত আকাশে ডানা মেলার পথ।

সাম্প্রতিক এই র‍্যাগিং নামক অপসংস্কৃতির ভয়াল থাবায় মৃত্যু হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের। যা ব্যথিত করেছে গোটা জাতিকে, পীড়া দিচ্ছে বিবেককে। যেখানে তাকে স্ট্যাম্প, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন করেছে একই হলের কিছু প্রবীণ ছাত্ররা, ভিডিও ফুটেজে যার নির্মমতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

যেখানে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে ব্যক্তির চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা। যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশ করতে পারবে। ফলে, ব্যক্তি যে কোন মাধ্যমে সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তার মতামত ব্যক্ত করতে পারবে, সমালোচনা করতে পারবে। এটি সংবিধান প্রদত্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। কিন্তু র‌্যাগিংয়ের নামে মতামত-সমালোচনা প্রদানের কারণে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মীদের তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কখনোই শুভ লক্ষণ নয়! যেমনটি ঘটেছে আবরার ফাহাদের ক্ষেত্রে।

শুধু আবরারই নয়, র‍্যাগিংয়ের নির্মমতার শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাতে হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম আবর্তনের ইলেক্ট্রিকাল সায়েন্স এন্ড ইন্জ্ঞিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ মিজানুর রহমানকে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে র‍্যাগিংয়ের বর্বর নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীকে যা ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে ধরা পড়েছে।

র‍্যাগিংয়ের নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহাদকে। এর কয়েক বছর আগে বৃষ্টির মধ্যে দাড় করিয়ে র‍্যাগ দেয়ার কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে এক ঢাবি শিক্ষার্থীকে। তছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অমানবিক এ র্যাগিং বিঘ্ন ঘটাচ্ছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ।

একই সূচনীয় অবস্থা দেশের প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নতুন বছরের শুরুতেই প্রবীনদের দ্বারা নবীনদের এক আতঙ্কের নাম র‍্যাগিং। র‍্যাগিং-এর নামে অকথ্য গালিগালাজ, অপরিচিত মেয়েকে প্রপোজ করানো, কান ধরে উঠ-বস করানো, অকথ্য গালামন্দ, অর্ধ-উলঙ্গ করে রাখা, কনকনে শীতে ঠান্ডা পানিতে ডুব দেয়ানোর মত হীন-নীচ কাজ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা কাম্য হতে পারে না।

তাছাড়া র‍্যাগিং কোনো বিশ্ববিদ্যলয়ের সংস্কৃতি হতে পারে না বরং এটি একটি অপরাধ। দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংস্কৃতির নামে এই অপসংস্কৃতির চর্চা লালন করে আসছে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ ভয়াবহতা থেকে আমাদের অচিরেই বের হয়ে আসতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা র‌্যাগিং কখনোই কাম্য নয়।

সংস্কৃতির নামে এই অপসংস্কৃতি রোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। সার্বিক নজরদারি ও এর সাথে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিতে হবে। এই অপসংস্কৃতি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে সচেতন হতে হবে কারণ অপরাধটি সংগঠিতই হয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা। শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টিই পারে এই অপসংস্কৃতি দূর করে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে।

র‍্যাগিং এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় হারাতে চায় না আর কোনো মেধাবী সম্পদকে। দেশ হারাতে চায় না তার অমূল্য রত্ন, বাবা-মায়ের নয়নের মণি।

মোঃ ইমরান
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
 
বাংলাপত্রিকা/এসএ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন