সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২ , ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২২

পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল আচরণ কমাতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা

১৯ জুলাই ২০২২ - রাত ১০:১৭
...

জীবন যুদ্ধে সবাই জয়ী হতে চায়। কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে মুখোমুখি হতে হয় অনেকগুলো পরাজয়ের। এই পরাজয়ের পর অনেকে এগুলোকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। আর কিছু মানুষ এই পরাজয়গুলোকে মেনে নিতে না পেরে জীবন সংগ্রামের ইতি টানেন।

যারা জীবন সংগ্রামে এগিয়ে যান তাঁদের পিছনে কিছু পজিটিভ এবং যারা হেরে যান তাঁদের পিছনে কিছু নেগেটিভ প্রভাবক প্রবলভাবে কাজ করে। আর এই প্রভাবকগুলো আসে আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকেই।

কয়েক দশক আগেও ডিপ্রেশন বলতে কোন শব্দ আমাদের সমাজে পরিচিত ছিলনা। কালের বিবর্তনে এটি যেন বাংলা ভাষায় জায়গা করে নিতে চলেছে। মানসিক সমস্যা কতটা প্রকট আমাদের দেশে তা অতি সম্প্রতি প্রকাশিত, 'গ্লোবাল ইমোশনস রিপোর্ট -২০২২' থেকেই প্রমাণিত। যেখানে ১২২ টি দেশে জরিপ চালানো হয় মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে। খারাপের দিক থেকে বাংলাদেশ রয়েছে ৭ম অবস্থানে। খারাপের দিক থেকে এক নাম্বারে অবস্থান করছে আফগানিস্তান।

সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে প্যারাগুয়ে এবং পানামা যৌথভাবে। তাঁরা কিন্তু বিশ্বের এক নাম্বার অর্থনীতির দেশ নয়।তারপরও তাঁরা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রেখেছেন।বাংলাদেশও যে চাইলে মানসিক স্বাস্থ্যের এই অবস্থার উন্নতি করতে পারে এই দুটি দেশ তার প্রমাণ। এ ছাড়াও আপনি যদি করোনাকালীন সময়ের দিকে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন ২০২০ সালের দশ মাসে করোনায় মারা গিয়েছিলো পাঁচ হাজারের কিছু বেশি মানুষ। এর বিপরীতে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল এগারো হাজারের বেশী। আমাদের এই অবস্থার অনেক বড় একটি কারণ হতে পারে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সাপোর্ট না পাওয়া।

বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো নায়ক রিয়াজের শশুর ধনাঢ্য মুহসিন খানের আত্মহত্যা। যার টাকা পয়সার কমতি না থাকলেও, কমতি ছিল পরিবারের মানুষগুলোর সাপোর্ট।

খুব দুঃখ করে বলেছিলেন তিনি লাইভে না আসলে হয়ত পরিবার জানবেও না যে, তিনি মরে পড়ে আছেন। একটা সময় গিয়ে কি পরিবারগুলো এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে যায় সেই পরিবারেরই আরেক সদস্যের উপর! এটা আসলে ভাববার বিষয়। একটা সময় গিয়ে যদি কোন ব্যক্তি দেখেন যে, তাঁর পরিবার তাকে বোঝা মনে করছে অথবা এড়িয়ে চলছে, তখন আসলে তাঁর জন্য পুরো পৃথিবীটাই ছোট হয়ে যায়।

মুহসিন খানের সেই আলোচিত ঘটনার পর আরও একটি ঘটনা আমরা দেখতে পেলাম সম্প্রতি।এখানেও সেই পরিবারের সাপোর্টের আকুতি উঠে এসেছে। মানুষ সামাজিক জীব।মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাহ! বর্তমানে যেন মানুষে-মানুষে সম্পর্কের চাইতে মানুষের সাথে ডিজিটাল দুনিয়ার সম্পর্কটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

কুষ্টিয়ার একসময়ের প্রভাবশালী ছাত্রনেতা গাজী আনিস।ব্যবসা ও রাজনীতিতে যখন ভালো করতে পারছিলেন না তখন ভুগছিলেন মানসিক বিষন্নতায়।হয়ত তিনি এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে পারতেন।কিন্তু তিনি যখন দেখলেন তার পরিবার থেকেও তাঁর এই বিপদে সাথে নেই তখন হয়ত মনে মনে ভাবছিলেন এই জীবন আর কার জন্য রাখব! গত ৪ই জুলাই সোমবার প্রসেক্লাবের সামনে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নেন জীবনের ইতি টানার।শরীরের ৯০ শতাংশ পুরে যাওয়ায় একদিনের মাথায় চলে যেতে হয় পরপারে।

শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়, এমন হাজারো পরিবার আছে যারা তাদের ব্যক্তিগত ক্রান্তিকালে পরিবার ও পাশের মানুষগুলোর একটু সাপোর্ট পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু এই সাপোর্টটুকুই কেন জানি আমরা আমাদের চার পাশের ভেঙে পড়া মানুষগুলোকে দিতে পারিনা।

আমরা সামষ্টিকভাবে একটি ইস্যু ভিত্তিক সমাজে বসবাস করছি।যখন কোন ইস্যু সামনে আসে সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা, সমালোচনা তোড়জোড় শুরু হয়। ওই ইস্যু শেষ হয়ে আবার আরেকটি ইস্যুর উদয় হয় এবং পূর্ববর্তী ইস্যুর মৃত্যু হয়। এভাবেই বছর ঘুরে বছর আসে। আর একটি জিনিস লক্ষণীয় যে, সেই ইস্যুগুলোর জন্ম এবং মৃত্যু উভয়েই ঘটে অনলাইনের মাধ্যমেই। কিন্তু আদতে সমস্যা কখনোই সমাধানের মুখ দেখেনা।

একটা সময় মানসিক চিকিৎসার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকলেও আত্মহত্যা সহ অন্যান্য মানসিক রোগগুলো এত বেশি ছিলনা। তাঁদের জন্য সাইকোলজিস্ট না থাকলেও ছিল পরিবার ও সমাজ।নিজের পরিবার থেকে বয়কট হলেও ছিল সুন্দর বন্ধু মহল। বর্তমানে পুরো সমাজটাই যখন অনলাইনে প্লাটফর্মে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তখন কে কার খোঁজ রাখে!

তবে হ্যাঁ, শুধু পরিবার ও সমাজই নয়, আমরা ব্যক্তিগতভাবে এমন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছি যেখানে ভোগবাদীতাই সব। ত্যাগেও যে সুখ এটা হয়ত ভুলতে বসেছি। চাওয়া পাওয়ার এতো অতিরঞ্জন আমাদেরকে নিমজ্জিত করছে এক অন্ধকার গহ্বরে। যার শেষ সীমায় অন্ধকার আর অন্ধকার। তবে আমাদের আশাবাদী হতেই হবে।ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুধারনাই ভবিষ্যৎ গঠনে আমাদেরকে সাহায্য করে থাকে।

সমুদ্রের পারে সারাদিন বসে ভাবলেও সমুদ্র পাড়ি দেয়া সম্ভব নয় যতক্ষণ না আমরা পা সামনে বাড়াচ্ছি। তাই মানসিক সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু আলোচনাই নয়, ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গণসচেতনতা তৈরী করা এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

পড়া হয়েছে: ৪৭১ বার
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরো পোস্ট