মণিরামপুরে সরকারি ঘর দেওয়ার নামে হাতিয়েছে ৩৫ লাখ টাকা

মেহেদী হাসান | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ০১:৩৭:১৩ এএম
মণিরামপুরে সরকারি ঘর দেওয়ার নামে হাতিয়েছে ৩৫ লাখ টাকা
‘জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পের অধিন ঘর দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিনশ হতদরিদ্রের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

দুই বছর পার হলেও ঘর অথবা টাকা ফেরত না দেওয়ায় হত দরিদ্রতা এখন ফুঁসে উঠেছে। হতদরিদ্রদের অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যান শাসছুল হক মন্টুর নাম করে কয়েকজন ইউপি সদস্য ও দালালরা এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর এ ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, যে সব হতদরিদ্রদের তিন থেকে ১০ শতক জমি আছে সেই সব ব্যক্তিদের সরকার ত্রাণ দূর্যোগ ও পুনর্বাসন মন্ত্রনালয়ের অধিন ‘জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য প্রকল্প গ্রহন করেন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। আর প্রতি ঘর নির্মানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় একলাখ টাকা করে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঝাঁপা ইউনিয়বের হতদরিদ্রের তালিকা চাওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের কাছে।

ইউপি সচিব এনামুল কবির জানান, ঝাঁপা ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টু ২২৬ জনের তালিকা প্রেরন করেন। কিন্তু সরকার বরাদ্দ দেয় ১০৩ টি। সে মোতাবেক টিনের ছাউনি সেমিপাকা এক কক্ষের (টয়লেটসহ) ঘর নির্মান করে দেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে ঘর দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিনশ হতদরিদ্রের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর নাম করে এ টাকা হাতিয়ে নেন ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ, শরিফুল ইসলাম, লাকি বেগম, শাহিন আরা, পরিষদের ই-সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ডলি খাতুনসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।

এছাড়াও টাকা হাতিয়ে নেন চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন কবির খান, আবুল কাশেম, মতিন সরদার, বজলুর রহমান, হাফিজুর খা সহ ৯/১০ জন। দুই বছর আগে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও অধ্যাবধি ওই সাড়ে তিন হতদরিদ্রদের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়নি। ফলে হতদরিদ্ররা টাকা ফেরত পেতে চেয়ারম্যান এবং ইউপিসদস্যের কাছে ধর্না দিলেও তারা কোন কর্নপাত করছেন না। ফলে হতদরিদ্ররা এখন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।

কথা হয় ঝাঁপা উত্তরপাড়ার মৃত কলিম গাজীর স্ত্রী ভিক্ষুক রাশিদা (৬০) বেগমের সাথে। তিনি জানান, কোন সন্তান না হওয়া এবং স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি পিতার ভিটায় তিনশতক জমির একপাশে মাটি এবং পলিথিন দিয়ে একটি খুপড়ি তৈরী করে বিধবা মা ফুলজান বিবির সাথে বসবাস করে আসছেন।

তিনি জানান, দুইবছর আগে ঘর নির্মান করে দেওয়ার জন্য তিনি ভিক্ষা করে চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর কাছে ১০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু এ পর্যন্ত তাকে ঘর নির্মান করে দেওয়া হয়নি।

হানুয়ার গ্রামের চায়ের দোকানি সোহরাব হোসেনের স্ত্রী রিজিয়া খাতুন জানান, স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ ঘর নির্মান করে দেওয়ার কথা বলে চেয়ারম্যানের নামে তিনি তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা গ্রহন করেন। শুধু রিজিয়া বেগম নয়, একই অভিযোগ করেন হানুয়ারের কুলসুম বিবি, আহম্মদ আলী, গোলাম রসুলসই অরো অনেকেই।

অপরদিকে হানুয়ার গ্রামের মতিয়ার রহমান, আলা উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম, সিদ্দিকুর রহমান, রহিমা খাতুন অভিযোগ করেন তাদের কাছ থেকে ঘর দেওয়ার নাম করে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য লাকি বেগম ১০ হাজার করে টাকা নেন।

দোদাড়ীয়া গ্রামের হতদরিদ্র মহাসিন কবির, মিলন হোসেন, আবুল হোসেন, ফরিদা বেগম, কুতুব উদ্দিন, আফসার মোড়ল, ফিরোজ হোসেন, লাল্টু হোসেন, সাহাবুদ্দিন, নুর জাহান বেগম, মালেক মোড়ল অভিযোগ করেন, স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্য শাহিন আরা ঘর নির্মানের জন্য তাদের কাছ থেকে অনুরুপ হারে টাকা আদায় করেন।

অভিযোগ রয়েছে অপর ইউপি সদস্য শরিফুল ইসলাম ঝাঁপা পশ্চিমপাড়ার ভিখারী ফাতেমা বেগম, আমেনা বেগমসহ বেশ কয়েকজের কাছ থেকে অনুরুপহারে টাকা আদায় করেন।

এ ব্যাপারে কথা হয় রাজগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আওয়ামীলীগ নেতা আবুল বাশার চাকলাদারের সাথে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে অধিকাংশ ইউপি সদস্য এবং বেশ কয়েকজন দালার অন্তত চারশ হতদরিদ্রের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন।

তার দাবি এ ব্যাপারে দুদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার।

সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা মিকাইল হোসেন একই অভিযোগ করে জানান, এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে পরিষদের ই-সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ডলি খাতুন অবশ্য ইতিমধ্যে ঝাঁপা উত্তরপাড়ার ভিখারী মাজেদা খাতুন, রোকেয়া খাতুন এবং কুলসুম বেগমকে টাকা ফেরত দিয়েছেন।

তবে ডলি খাতুন জানান, তিনি কারোর কাছ থেকে টাকা গ্রহন করেননি এবং ফেরতও দেননি।

টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা শামছুল হক মন্টু বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে হেয়প্রতিপন্ন করতে একটি কুচক্রি মহল আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছেন।

ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ, লাকি খাতুন, শাহিন আরা, শরিফুল ইসলামও একই দাবি করেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ বায়োজিদ জানান, তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেননা।

জেলা যুবমহিলা লীগের সহসভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান নাজমা খানম এ ব্যাপারে দোষিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এ ব্যাপারে কোনপ্রকার ছাড়া দেওয়া হবেনা। দোষিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মনিরামপুর প্রতিনিধি/এনপি/বাংলাপত্রিকা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন