হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেঁজুর রস

আব্দুল্লাহ আল হাসিব | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ১২:৪১:৩১ পিএম
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেঁজুর রস
শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে সুস্বাদু খেজুরের রস খাওয়ার মজাই যেন আলাদা। কিন্তু সেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুরের রস এখন আর তেমনটা দেখা যায় না।

একসময় মোসুমী খেজুর রস দিয়েই গ্রামীণ জনপদে শুরু হতো শীতের আমেজ। শীতের সাথে রয়েছে খেজুর রসের এক অপূর্ব যোগাযোগ। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হতো পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালী তৈরির ধুম। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলেন গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও বাঁলী গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যেতো।

খেজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠাসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারেরতো জুড়িই ছিলোনা। এসময় মায়ের হাতে বানানো হরেক রকমের পিঠা-পুলি খাওয়ার ধুম পড়ে যেত। এজন্য একসময় তীব্র শীতের মাঝেও খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত থাকতেন গাছিরা। সময়ের পরিক্রমায় আধুনিক নগরায়নের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ এবং গাছের রস।

খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের নিয়ম হলো প্রথমে খেজুর গাছের মাথার অংশের কাছাকাছি ভালো করে পরিষ্কার করে গাছের ভেতরের রস বের করার জন্য গাছের সাদা অংশ বের করতে হবে। এরপর পরিষ্কার করা সেই সাদা অংশ থেকে বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় মাটির পাত্র যেমন ঘটি, কলস ইত্যাদি দিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই গাছিদের কোমড়ে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুলে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ করতে হয়। গাছিরা প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোট-বড় কলসি বাঁধে রসের জন্য। আবার কাকডাকা ভোরে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য নিয়ে যায় বিভিন্ন এলাকায়।

খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারন ইটের ভাটায় ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করা হয়। দামে সস্তা হওয়ায় ইটের ভাটায় এই গাছই বেশি পোড়ানো হয়। খেজুর গাছের ব্যাপক নিধনের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানের মত দক্ষিনাঞ্চলেও কমছে খেজুর গাছ। ফলে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে খেজুরের রস। তবে এখনো কিছু খেজুরের গাছ থাকলেও গাছির সংকটে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। কয়েক গ্রামের ব্যবধানে দু’একজন গাছি পাওয়া গেলেও গাছ তুলনামূলক কম থাকায় রস সংগ্রহের কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে না।

বাকেরগঞ্জের গাছি আনোয়ার বলেন, আগের মতো খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর সেই রমরমা অবস্থা নেই। ফলে শীতকাল আসলে নিজের বাড়ির ৪-৫টা খেজুর গাছ শখের বসে কাটি। এসব অঞ্চলে প্রতি হাড়ি খেজুর রস ২০০-৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাও চাহিদার তুলনায় খুবই কম।

স্থানীয়রা জানান, আগে শীত আসলে মিষ্টি রোদে বসে খেজুরের রস খেতাম। কিন্তু এখন সারা গ্রাম খুঁজেও কোথাও খেজুরের গাছ বা গাছি কারো সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই সকলেরই খেজুর গাছ লাগানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেজুরের রসের কথা শুধু বই পুস্তকে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে তা পাবে না।

এনপি/বাংলাপত্রিকা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন