করোনাকালে চট্টগ্রামে শিল্পখাতে বিনিয়োগ বেড়েছে দ্বিগুণ

চট্টগ্রাম ব‍্যুরো | অর্থনীতি
প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ০১:০৮:৩০ পিএম
করোনাকালে চট্টগ্রামে শিল্পখাতে বিনিয়োগ বেড়েছে দ্বিগুণ
চট্টগ্রামে ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর, জাহাজকাটা শিল্প, লাইটার জাহাজ, ইটভাটা ও কৃষিভিত্তিক খাতে গত এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে দ্বিগুণ। তবে দেশে বিনিয়োগের হার বাড়লেও কমেছে কর্মসংস্থানের হার। করোনাকালীন সময়ে এ বিনিয়োগের হার দেখে রীতিমত বিস্ময় প্রকাশ করেছে অনেকে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৩ হাজার ২২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। নিবন্ধিত এ ৮৭টি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১২ হাজার ৮৫৮ জনের। এর আগের অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগের হার অনেকাংশ বাড়লেও কমেছে কর্মসংস্থান।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা) সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রামে বিনিয়োগের জন্য ৮৭টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। নিবন্ধিত এ ৮৭টি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছিল ১২ হাজার ৮৫৮ জনের। এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিবন্ধন করে ১৬২টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। তাদের বিনিয়োগের প্রস্তাবনা ছিল ১ হাজার ৪৮৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ অর্থবছরে কর্মসংস্থান হয়েছিল ১৪ হাজার ৮৭ জনের। এছাড়াও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৯৭ জনের।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে আরও জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদেশী ও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের জন্য ১২টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করে। তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭৩৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তাছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন করে ১২টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের হার ছিল ৫২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। তাছাড়া, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদেশী ও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগকারী ১২টি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছিল ১ হাজার ৪১৮ জনের। তার আগের অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২টি বিদেশী ও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪১৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছিল।

অপরদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪টি এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) বাতিল করা হয়। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বেলিংক কন্টেইনারস লিমিটেডের স্বত্তাধিকারী নাঈম চৌধুরী ৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ইনলেন্ড কন্টেইনার ডিপোতে বিনিয়োগ করেন। নাহার এগ্রো গ্যারেন্ট পেরেন্ট লিমিটেডের স্বত্তাধিকারী মো. রাকিবুর রহমান টুটুল ৫২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন এগ্রো ফার্মে (গ্র্যান্ড প্যারেন্ট) এবং এমরানী ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেডের স্বত্তাধিকারী মো. এমরান ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন অটো ব্রিক্স খাতে।

ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনার কারণে একটা কঠিন সময় পার করতে হয়েছে সকল ব্যবসায়ীদের। লকডাউন শিথিল হবার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি পুষিয়ে আনতে তৎপর সকলেই। তাই লাভের আশায় বিনিয়োগের প্রতি ঝুঁকেছে সকলেই। ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল হলে সামনে বিনিয়োগ আরো বাড়বে বলে আশাবাদী তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. জ্যোতি প্রকাশ দত্ত  বলেন, ‘চট্টগ্রামে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের হার বাড়বে। তবে এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। একটা গার্মেন্টস শিল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিনিয়োগ করা বা কর্মসংস্থান তৈরি করার সক্ষমতা বেড়ে যায়। অপরদিকে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হতে যেমন সময় লাগবে, তেমনি কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা সেখানে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে করোনার ধাক্কা সামলে আমাদের দেশীয়, বৈদেশিক ও যৌথ বিনিয়োগ বেড়েছে যা ইতিবাচক দিক বলে আমি মনে করি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম  বলেন, ‘করোনার দীর্ঘ একটা প্রভাবে বিনিয়োগে ধীরগতি নেমে এসেছিল। তবে বিনিয়োগের হার আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে, তাই সার্বিকভাবে আমরাও একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আনোয়ারা ও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিশাল বিনিয়োগের সম্ভাবনা দ্রুত কাজে লাগাতে প্রয়োজন প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা। তবে আমরা আশাবাদী বিনিয়োগের পরিমাণ সামনে আরো বাড়বে। করোনার কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে ছিল। তাই অনেক কর্মীকে বাধ্য হয়ে ছাঁটাই করতে হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক গতিবিধি বাড়লে এবং চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থানের হার বহুগুণে বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইয়াসিন  বলেন, ‘চট্টগ্রামে বিনিয়োগের হার বেড়েছে। পাশপাশি বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের হারও বেড়েছে। এটা খুশির বিষয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগের উপর জোর দিয়েছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে চেম্বারের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কারখানা মালিকদের সাথে বৈঠক করছি। পাশাপাশি আগামীতে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হবে, তখন বিনিয়োগ নিবন্ধন আরো বাড়বে বলে আশা করছি। ক্ষুদ্র মাঝারি এবং বড় ব‍্যবসায়ীদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে বিনিয়োগ বোর্ড বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলেও তিনি জানান।

কর্মসংস্থনের হার কেন কমেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কম লোক দিয়ে কাজ করানোই হলো কারখানাগুলোর উদ্দেশ্য। এটা সরকারের পলিসিও বটে। পাশাপাশি করোনায় কারখানা চলেনি। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। তাই কর্মসংস্থানের হারও কমেছে। তবে এখন আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে। তাই কর্মসংস্থানের হারটা সামনে আরো বাড়বে বলে আশা করছি।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, চট্টগ্রামের বিনিয়োগে আমরা আশাবাদী। এ বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আরো নানামুখী পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে। বিশেষ ক্ষুদ্র ব‍্যবসায়ীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তার জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে।

মোঃ সিরাজুল মনির/এনপি/বাংলাপত্রিকা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন