সাতক্ষীরায় ৪ খুন: কেমন আছে বেঁচে যাওয়া শিশুটি

নিজস্ব প্রতিবেদক | সারাদেশ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ০৬:৫৯:২১ পিএম
সাতক্ষীরায় ৪ খুন: কেমন আছে বেঁচে যাওয়া শিশুটি
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় গলা কেটে স্বামী-স্ত্রীসহ চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ৪ মাসের ফুটফুটে কন্যা শিশু মারিয়া এখন কেমন আছে। কীভাবে আছে। ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করছে কিনা। কার কাছে আছে- এমন সব প্রশ্ন জাগছে সাতক্ষীরাসহ দেশবাসীর মনে।

কিন্তু মারিয়া এখনো জানে না তার জন্মদাতা মা-বাবা ও আদরের ছোট্ট দুই ভাই-বোনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

গত ১৫ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) ভোরে কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলিসা গ্রামের নিজবাড়িতে নিহত ৯ বছরের ভাই সিয়াম হোসেন মাহি ও ৬ বছরের বোন তাসনিম ও মা সাবিনা খাতুনের গলা কাটা নিথর দেহের পাশে রক্তের উপরে শুয়ে দুধের তৃষ্ণায় কান্নায় ছটফট করতে থাকা শিশু মারিয়াকে উদ্ধার করে প্রতিবেশী আনিছুর রহমান। এসময় পাশের রুমে পা বাঁধা ও খাটের বিছানার উপর গলা কাটা অবস্থায় পিতা হ্যাচারির মালিক মাছ ব্যবসায়ী শাহিনুরের মরদেহ পড়ে ছিলো।

পরে দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল ঘটনাস্থলে এসে কন্যা শিশু মারিয়াকে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কোলে তুলে নিয়ে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করে হেলাতলা ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের কাছে তুলে দেন। এরপর থেকে ইউপি মেম্বার মায়ের মমতা ও আদর দিয়ে লালনপালন করছেন শিশুটিকে।

গত ৫ দিন যাবত শিশুটি এখন ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের কাছে রয়েছে। তিনি এখন শিশুটির দেখভাল করছেন। প্রতিদিন মারিয়াকে দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ভিড় জমাচ্ছেন ইউপি সদস্যের বাড়িতে। নাছিমা খাতুন মায়ের মমতা ও আদর যত্ন দিয়ে লালন করছেন শিশুটিকে। বাড়িতে কোন শাড়ি পরিহিত মহিলা দেখলেই শিশু মারিয়া তার গর্ভধারিণী মায়ের মুখের খোঁজে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কখনো কখনো হাসছে আবার কখনো হঠাৎ করে আঁতকে কেঁদে উঠে। তখন কোনভাবেই সে কান্না থামানো যাচ্ছে না।

আবার কখনো কান পেতে মানুষ জনের কথা শুনছে। কিন্তু নিজ মায়ের কোলহারা শিশুটি সুস্থ আছে বলে জানালেন ইউপি সদস্য নাছিমা খাতুন।

মারিয়ার কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মারিয়ার শেষ ঠিকানা কোথায় হবে জানি না। আমার দুই ছেলে, কোনো মেয়ে সন্তান নেই। এখন থেকে মারিয়াই আমার কন্যা সন্তান। নিজ খরচে বাবা মায়ের স্নেহ ভালবাসা দিয়ে আমি ওকে বড় করতে চাই। এজন্য প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল আইনগতভাবে যদি শিশুটিকে লালন পালন করার দায়িত্ব দেন তাহলে আমি তার প্রতি এবং সরকারের প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকবো। আমার বড় ছেলের ৮ মাসের একটি বাচ্চা আছে। শিশু মারিয়াকে পরিবারে আনায় পরিবারের সবাই দারুণ খুশি।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী জেরিন কান্ত বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে শিশুটিকে ইউপি সদস্যের হেফাজতে রেখে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছি ও দেখভাল করছি। তার জন্য খাদ্য ও পোশাক কিনে দিয়েছি। তার স্বাস্থ্যসেবার খোঁজ নিয়েছি।

জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, বাবা-মা, ভাই-বোনসহ একই পরিবারের ৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করায় এই মুহূর্তে শিশু মারিয়ার কোনো অভিভাবক নেই। যাতে কন্যা শিশু মারিয়া ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে, আমি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আপাতত তাকে কলারোয়ার হেলাতলা ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের কাছে রাখা হয়েছে। তবে তার অভিভাবকরা নিতে চাইলে আইনুযায়ী তাদের কাছে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতের কোন এক সময়ে কলারোয়া উপজেলার খলসি গ্রামের একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যার ঘটনার পর শিশু মারিয়াকে ঘাতকরা নিহত মা ও ভাইবোনের পাশে রেখে চলে যায়। শাহাজান আলীর ছেলে হ্যাচারি মালিক নিহত শাহিনুর রহমান ও তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন, ছেলে সিয়াম হোসেন মাহি ও মেয়ে তাসনিমকে কলারোয়ার ব্রজবাকসা গ্রামে নানার বাড়িতে দাফন করা হয়। রাতে শাহিনুরের শাশুড়ি ময়না খাতুন বাদী হয়ে কলারোয়া থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাৎক্ষণিক কলারোয়া থানা পুলিশ কূলকিনারা করতে না পারায় এই মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সাতক্ষীরা সিআইডি পুলিশকে। এরপর নিহত শাহিনুরের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে সাতক্ষীরা সিআইডি পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ১৮ অক্টোবর রোববার গ্রেপ্তার নিহতের ভাই রায়হানুল ইসলামকে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে ওইদিনই ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রায়হানুলকে সিআইডি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।

এ লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সাতক্ষীরা সিআইডি পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত। কোন ভাড়াটিয়া কিলার দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হতে পারে। এজন্য একটু ধৈর্যধারণ করতে হবে। অধিকতর তদন্ত চলছে। অচিরেই মামলার ক্লু বেরিয়ে আসবে। খুনিদের গ্রেপ্তার করতে সিআইডি পুলিশ অবশ্যই সক্ষম হবে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন