কোম্পানীগঞ্জে গ্রাম্য ডাক্তারদের দৌরাত্বে অসহায় রোগিরা

আবদুর রহিম, কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি | সারাদেশ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২০ | ০৬:৩১:০৯ পিএম
কোম্পানীগঞ্জে গ্রাম্য ডাক্তারদের দৌরাত্বে অসহায় রোগিরা
কোম্পানীগঞ্জে ব্যবস্থাপত্রে বড় বড় ডিগ্রি, এমবিবিএস পাস না করেও তারা সকল রোগের চিকিৎসক। এমনকি অনেকেই করছেন অস্ত্রোপচারও। অথচ তারা পল্লী চিকিৎসক। এদের দৌরত্বে অসহায় পড়েছে সাধারণ রোগিরা।

মাথা ধরুক, শরীর ব্যাথা হোক, দাঁত ও গলায় ব্যাথা হলেও এই সকল ডাক্তারগণ প্যারাসিটামল, সিপ্রোফ্লক্সাসিলিন ও এজিথ্রমাইসিনসহ নানা প্রকার এ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে দেন। রোগিরা ব্যাথা একটু কমলেই তা আর খায়না। আসলে কোন রোগে কোন এ্যান্টিবায়োটিক ও কতদিন খেতে হবে তা এই সকল গ্রাম্য ডাক্তারাগণ জানেন না। অথচ তারা সামান্য রোগের কারনে রোগি গেলেই শত শত টাকার ওষুধ দিয়ে দেন।

এই সকল ডাক্তারগণ আরএমপি (রুরাল মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার) কোর্স করেই এমবিবিএস চিকিৎসকের মতোই করছেন জটিল সব রোগের চিকিৎসা।

ডিজিটাল ব্যানার ও চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের নামে ভিজিটিং কার্ড ও প্যাড ছাপিয়ে আইন অমান্য করছেন। নামের আগে পদবি লিখছেন ডাক্তার। তাদের ভুল চিকিৎসা, মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের প্রেসক্রিপশনের কারণে হরহামেশাই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। ডাক্তার রূপধারী এই পল্লী চিকিৎসকদের ওপর প্রশাসনের নজর বা নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই নেই। একারনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন গ্রামের অসংখ্য মানুষ। আবার এই সকল ডাক্তারগণ রোগি ধরে শহরে নিয়ে এসে নামমাত্র ডাক্তার দিয়ে দেখিয়ে রোগ নির্ণয় করার নামে হাজার হাজার টাকা প্যাথলজি ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজস করে হাতিয়ে নিচ্ছেন।

জানা যায়, আরএমপি, ডিএমএফ ও এলএমএএফ কোর্স করে নামের আগে ‘ডাক্তার’ লিখে রোগী দেখলেও এই পল্লী চিকিৎসকদের রোগী দেখার আইনগত অনুমোদন বা যোগ্যতা কোনোটাই নেই। এই চিকিৎসকদের অনেকেই নুন্যতম এসএসসিও পাস করেননি অনেকেই। সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান এবং জটিল-স্পর্শকাতর রোগীদের বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে প্রেরণের নিয়ম। অথচ তারা করছেন ঠিক এর উল্টো। চিকিৎসার নামে সাধারণ-জটিল সকল রোগের চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিয়ে চলেছেন তারা। অসহায় রোগীদের তারা ব্যবহার করছেন ‘গিনিপিগের’ মতো।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পল্লী চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। চটকদার সাইন বোর্ড টাঙ্গিয়ে নিজেদের নামের আগে ডাক্তার উপাধি আর ডিপ্লোমা প্যারামেডিক, এলএমএএফ, ডিএইসএস, শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের মত ভারী শব্দ লাগিয়ে দেদারছে অপ ‘চিকিৎসা-বাণিজ্য’ চালাচ্ছেন এরা। চেম্বার খুলে সাইনবোর্ডে নামের সঙ্গে ডাক্তার উপাধি ও ডিগ্রির বহর যোগ করে এভাবেই প্রতারণা করে যাচ্ছেন।

গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক সংকট থাকায় এবং মানুষের সচেতনতার অভাবকে পুঁজি করে বছরের পর রোগী দেখে যাচ্ছেন তারা। রোগমুক্তি তো দূরের কথা, এসব ভুয়া চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে নানান জটিলতায় ভুগছেন হাজারো রোগী। এছাড়া মাঝেমধ্যেই তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মারা যাওয়া মতো ঘটনাও ঘটছে। আবার অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে রোগকে আরো জটিল থেকে জটিলতর পর্যায়ে নিয়ে নিরাময়-অসম্ভব করে ফেলছেন।

নিজের চেম্বার খোলার পাশাপাশি এসব পল্লী চিকিৎসক ওষুধও বিক্রি করছেন। নিজেই ডাক্তার, নিজেই আবার ওষুধবিক্রেতা। একারণে রোগীদের মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের প্রেসক্রাইবও করছেন দেদারসে। নিজেদের আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে গ্রামের অশিক্ষিত-অল্প শিক্ষিত তথা গরিব মানুষদের আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত করে ফেলছেন এরা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, পল্লী চিকিৎসকের কাছে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় তারা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন। সামান্য অসুখেও তারা উচ্চমাত্রার এ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দিচ্ছেন। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছেন জটিল রোগে। ফলে রোগ নিরাময়ে সময় বেশি লাগছে। অনেক রোগী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছেন। এতে পরবর্তী সময়ে একদিকে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছেন না, অন্যদিকে রোগীর খরচও বাড়ছে। এসব রোগীর রোগ নির্ণয়েও অনেক সময় হিমশিম খেতে হচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।

কোম্পানীগঞ্জের আশপাশের গ্রাম-গঞ্জে শত শত লাইসেন্সবিহীন ডাক্তার নামধারী চেম্বার খুলে জাঁকিয়ে বসেছেন ব্যবসা। শুধু তাই নয় শহরের পান, মুদি, মনোহারী ও ষ্টেশনারী দোকানেও বিক্রি হয় ওষুধ। তারাও একভাবে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন থেকে। পাড়া মহল্লায় এগুলো সব থেকে বেশী। রোগি যেয়ে রোগের কথা বললেই তারা ওষুধ দিয়ে দেন।

এই সকল ডাক্তারের চিকিৎসা করা নিয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন বলেন, নুন্যতম এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্ত ব্যতীত কেউ নামের আগে ডাক্তার পদবি লিখতে পারবেন না। কিন্তু পল্লী চিকিৎসকরা নামের আগে ডাক্তার লিখছেন। আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। বিভিন্ন সময়ে তাদের সাথে কথা বলে সতর্ক করা হয়েছে। তবে কেউ লিখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব ভ্রাম্যমাণ আদালতের। এখানে আইনগত বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার তাদের হাতে নেই।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক জানান, এ ধরনের অপচিকিৎসকদের বিষয়ে তারা অবগত রয়েছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসনকে প্রতিদিন অনেকগুলো সরকারি কাজ সম্পাদন করতে হয়। এর বাইরে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা রোজই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন জানান তিনি। এই বিষয়টি নিয়েও তারা এর আগে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। তবে জনস্বাস্থ্য’র বিষয়টি সবার আগে। তাই শিগগিরই এ ব্যাপারে বেশি বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। ‘বিএমডিসি অ্যাক্ট অনুযায়ী এমবিবিএস পাসকৃত চিকিৎসক ও ডেন্টাল সার্জন ছাড়া কাউকেই তাদের নামের আগে ডা. (ডাক্তার) লিখেতে দেওয়া হবে না। এছাড়া তাদের চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে হুঁশিয়ারী দেন তিনি। কারণ এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাপত্রিকা/এনপি

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন