`শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সময় এখনই'

মোঃ আরাফাত রহমান | পাঠক কলাম
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০:৩৫:৪০ এএম
`শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সময় এখনই'
দীর্ঘদিন ধরেই চলছে করোনা মহামারী। দেশের সব সেক্টর অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসলেও এখনো বন্ধ রয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ছুটি। কবে খুলবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। উল্টো ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ছুটি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্ত শিক্ষাবোর্ড কমিটির একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হলেও এটি নিয়ে কোন গ্ৰহণ যোগ্য সমাধানে পৌঁছুতে পারেনি তারা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কোন ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে শিক্ষা বোর্ড কমিটির সভা। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হচ্ছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে কেন সরকার কোন সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছে না?

দেশের করোনা মহামারী কি এতোটাই বেগতিক যে, এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে রাখতে হবে? এটি কি কোন বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত? বিশ্বের যে সকল দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণ সবচেয়ে বেশী ছিল যেমন, ইটালি, ইরান ইত্যাদি দেশে ইতোমধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এই দেশগুলোতে এখনো করোনা সংক্রমণ আছে এবং মৃত্যুহারও শুন্যের কোটায় নেমে আসেনি। বাংলাদেশের চেয়েও এই দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার অনেক বেশী।

আমাদের দেশে করোনা যতোটা বেশী সংক্রমণ হয়েছে আমরা তার চেয়ে বেশী ভীতি ছড়াচ্ছি। করোনা এখন আর ভালো না হওয়ার মতো কোন রোগ নয়। প্রতিদিন আমাদের দেশের সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের পরিসংখ্যান হিসাব করলে এটি খুব সহজেই বোঝা যাবে। শতকরা ৩-৪ পার্সেন্ট মৃত্যু হয় এবং ভালো হওয়ার হার ৯০শতাংশের বেশী। তাছাড়া বিশ্বের অনেক দেশই ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন বাজারে ছেড়েছে। আমাদের দেশেও ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে এবং বাণিজ্যিক ভাবে তা বাজারে আনার প্রস্তুতি চলছে। সুতরাং ভয়ের তো কিছু নেই।

এখন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার বিকল্প হিসেবে আমরা অনলাইন ক্লাসকে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে দাড় করাতে পারিনি। সরকারের তরফ থেকে বাধ্যতামূলক অনলাইন ক্লাসের কথা বলা হলেও অধিকাংশ সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এটি মেনে চলা হচ্ছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এখন সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা পড়ছে সেশনজটে। তাদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই আমরা একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার কথা শুনেছি। বিষয়টি অবশ্যই দুঃখ জনক। এখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিষয়ে কোন যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা আরো ঘটতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে, এই বিষয়টির সাথে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে একমত হতে পারছি না। বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো গত মাস থেকেই খুলে দেয়া হয়েছে, তারপরও আমরা কোন শিক্ষার্থী সংক্রমিত হতে দেখিনি। সুতরাং, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে এই দাবী নিতান্তই অযৌক্তিক। তাছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক করোনা হাসপাতাল বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমছে। তাই এখনই উপযুক্ত সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো খুলে দেয়ার। অন্যথায় শিক্ষা খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব হতে পারে। অটো প্রমোশন বা সিলেবাসে কাটছাঁট করে আমরা যতোই ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করি না কেন, এটি তখন আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলেই কি করোনা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসবে? রাজনীতি, মিটিং মিছিল, উপনির্বাচন সহ সব কর্মকান্ডই চলছে লাগামহীন ভাবে। হাটবাজার, পরিবহণ, ব্যাবসায়-বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোন কিছুই তো বন্ধ নেই। তবে কেন মহামারীর অযুহাতে শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখা হবে? এ বছরের এইচএসসি থেকে শুরু করে সিইসি ও জুনিয়র সমাপনী এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষা গুলো বাতিল করে কোন রকম মূল্যায়ন ছাড়াই সনদ দেয়া হলে তা আমাদের জন্যই সাপে বর হয়ে দেখা দেবে। অটো প্রমোশন থেকে বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়িত সনদ, এর সবকিছুই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনী সংকেত। দুর্যোগ কালীন মুহুর্তে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এমন অবহেলা ও হঠকারিতা মূলক সিদ্ধান্ত আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেবে। তার ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

করোনায় সবচেয়ে বেশী ভীতিতে আছে আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ। মাস্ক, স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব এই বিষয়গুলো এদেশের গ্ৰাম বাংলার মানুষ কম বোঝে। তাই তাদের মনে ভীতির পরিমানটাও কম। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ গুলো এদের সার্বিক করোনা মহামারীর বিষয়ে ভালভাবে অবগত হয়েও একটা অদৃশ্য কোন ভীতিতে আক্রান্ত হয়েছে। আমার মনে হয়, করোনার ভ্যাকসিন আনার আগে এদের ভীতি দুর করার ভ্যাকসিন দরকার।

করোনা মহামারীতে সবচেয়ে বেশী হঠকারী ভূমিকা পালন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান ও দেশব্যাপী অনলাইন ক্লাস নিশ্চিত করার ক্ষেত্র মন্ত্রণালয়টির কোন সক্রিয় ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়নি। উপরন্তু ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো সহ এখন পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা নিতে না পারা, অটো প্রমোশন, বিনা পরীক্ষায় সনদ দেয়ার মতো নানা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং আর কালবিলম্ব না করে এখনি উচিত বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা পূণরুদ্ধারে একটি বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।

মোঃ আরাফাত রহমান
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক কলামের কোন লেখার বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোন দায় নিবে না। লেখক তার নিজের লেখার জন্য সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করবেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন