মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হয়েও তালিকায় নেই সাহাদত মাষ্টারের, শয্যাশায়ী স্ত্রী ছকিনা

মোঃ মনিরুজ্জামান, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২০ | ০৩:০৭:৪৮ পিএম
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হয়েও তালিকায় নেই সাহাদত মাষ্টারের, শয্যাশায়ী স্ত্রী ছকিনা
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তালিকায় নাম নেই সাহাদত মাষ্টারের। অতিকষ্টে জীবিকা নির্বাহ করে মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সন্মান থেকে বঞ্চিত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও তার পরিবার ও জীবিত স্ত্রী ছকিনা বেওয়া পায়নি সরকারী কোন সুযোগ সুবিধা। বিনা চিকিৎসায় মৃত পথযাত্রী তাঁর স্ত্রী বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন ছকিনা বেওয়া। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাগভান্ডার গ্রামের মৃত কছিম উদ্দিন ডাক্তারের পুত্র সাহাদত হোসেন। যিনি ‘সাহাদত মাষ্টার’ নামে সুপরিচিত। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫৩ সালে নীলফামারী পিটিআই থেকে ভূরুঙ্গামারীর ১ম সিইনএড ধারী সাহাদত মাষ্টার প্রাইভেটে এইচএসসি পাশ করেন ১৯৬৫ সালে। পিটিআই প্রশিক্ষণ কালীন সময়ে তিনি নীলফামারী থেকে রাইফেল ট্রেনিং রপ্ত করেন। পরে উপজেলার পাইলট হাই স্কুলে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। চাকুরীকালীন সময়ে তিনি আলসারে আক্রান্ত হন। অপারেশনের জন্য পুরাতন ভূরুঙ্গামারী অর্থাৎ বর্তমানে নলেয়ার কুড়ার পার নামক স্থানের পাশে কয়েক বিঘা জমি বিক্রি করেন। কিন্তু অর্থের সংকুলান না হওয়ায় আব্দুল হাকিম সাহেবের নিকট নামমাত্র টাকায় চাকুরী বিক্রি করে অপারেশন করান। পরবর্তীতে পরিবার পরিজন নিয়ে চলে যান লালমনিরহাট জেলায়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আবার ফিরে আসেন ভূরুঙ্গামারীতে। শামছুল হক চৌধুরীর সহায়তায় সাব-রেজিস্টার অফিসে কিছুদিন ডিড রাইটার হিসেবে কাজ করেন। তার হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর।

স্বাধীনতা উত্তর ও তার পরবর্তী সময়ে ভূরুঙ্গামারীতে হাতে গোনা যে কয়েকজন ব্যক্তি ভূরুঙ্গামারীর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ভূরুঙ্গামারীর ভালো কাজে জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাহাদত হোসেন মাষ্টার।

১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত পাবলিক ক্লাব ও লাইব্রেরী (বর্তমানে পাবলিক লাইব্রেরী ও ক্লাব) এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে সমÑসাময়িক সহপাঠী অধ্যাপক মজিবর রহমান, আঃ জব্বার সরকার, আঃ কাদের ব্যাপারী, ডাঃ নিয়ামত আলী প্রমূখ ব্যক্তিদের সাথে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেন তিনি। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আসামের গোয়াল পাড়ার ঝাউকুঠি শরনার্থী শিবিরের ত্রাণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব আসে তার উপর। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন বলে জানিয়েছেন তার সহযোগিরা।

১৯৯৫ সালের মে মাসে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই গুণী সংগঠক। স্বাধীন দেশের সরকারগুলো মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর পূনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া শুরু করলে পরিবারে পক্ষ থেকে সংশিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের কাছে বার বার আবেদন করে কোন সুফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিলেন তার সন্তানেরা। তবে ২০১০ সালে আবেদনকারীদের আবেদন যাচাই বাছাইয়ের জন্য ভূরুঙ্গামারীতে একটি তালিকা আসে তালিকার ৭০ নম্বর ক্রমিকে সাহাদত মাষ্টারের নাম পাওয়া গেলেও সে তালিকা আলোর মুখ দেখেনি এ পর্যন্ত।

এছাড়াও, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটি কুড়িগ্রাম এর পক্ষ থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালে “মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রাম” নামে ১টি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত ম্যাগাজিনের ২ নম্বর ক্রমিকে সাহাদত মাষ্টারের নাম পাওয়া যায়। বর্তমান সরকারের শাসন আমলে ২রা ফেব্রুয়ারী’১৩ সালে অন লাইন মুক্তিযোদ্ধা নিবন্ধন ফরম পুরণ করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। যায় নম্বর ডি.জি ১২১৩৯৭। শুধু তাই নয়, ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক সাবেক গভর্ণর, এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান শামছুল হক চৌধুরীর একান্ত সহযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাহাদত মাষ্টার। বাংলা ১৩৫৮ সালের বৈশাখ মাসের কোন এক বুধবারে সে সময়ের ধনাঢ্য ব্যক্তি এফাজ হাজী সাহেবের মেয়ে সখিনাকে বিয়ে করেছিলেন। সাহাদত সখিনা দম্পতির চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। পরে অবশ্য রাহেলা বেগম নামে আর একজন কে বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রাহেলা বেগম বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৮ই অক্টোবর’১৫ প্রায় বিনা চিকিৎসায় ইহলোক ত্যাগ করেন।

স্ত্রী ছকিনা বেওয়া (৭৮) কান্নাজড়িত কন্ঠে তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তালিকা ভুক্তি না হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ঐ সময় তিনি মুখ খুলে কাউকে কিছুই বলেননি। কাকে বলবেন? সেই সময়ে উপজেলার প্রায় সবাই যে তাঁর ছাত্র অথবা ছাত্রের বয়সী। তিনি শুধু স্যারই নন, সকলের প্রিয় স্যার ছিলেন। শিক্ষকতা, খেলাধূলা, নাটক থেকে শুরুকরে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিলেন সমান পারদর্শী। তার মুখ থেকে শুনেছি, তিনি যখন ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তখন গরুর গাড়ি করে বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁকে লোকে দেখতে এসেছে। জন্ম তাঁর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। অথচ সেই মানুষটি অত্যন্ত অনাদরে অবহেলায় কাটিয়েছেন জীবনের শেষ বেলা। কিন্তু কখনো কাউকে কিছু বুঝতেই দেননি। হয়তো অভিমান আর অপমানবোধ কাজ করেছে তাঁর মনে। তিনিতো চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা কেমন আছেন? না ভালো নেই তার পরিবার। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হয়েও পরিবারটির সদস্যরা পায়নি কোন মর্যাদা। পায়নি কোন সাহায্য কিংবা সহানুভূতি।

তাঁর ছেলে রবিউল আলম লিটন জানান,আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশিদার হিসাবে গর্বিত হয়েও স্বীকৃতি পায়নি। আমরা তাঁর সন্তানেরা এ দুঃখ আজীবন বয়ে বেড়াতে চাই না।  

তাঁর সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের ভারতে ঝাউকুঠি যুব শিবির অধ্যক্ষ ও  সহকারী অধ্যাপক মজিবর রহমান বলেন, যুদ্ধকালিন সময়ে ঝাউকুঠি যুব শিবিরে প্রথম থেকেই খাদ্য সরবরাহ কাজে নিয়োজিত ছিলএবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতেন।আমি তাঁকে নিয়োগ পত্র ও ছাড় পত্র দুটোই দিয়ে ছিলাম। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাহাদত মাস্টারের নাম তালিকা ভুক্তি হয়নি এটা  অত্যন্ত দুঃখজনক।

দির্ঘদিন ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ভুক্তির জন্য বারবার স্যারের নাম সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠালেও অদৃশ্য কারণে তাঁর নাম তালিকা ভুক্তি হয়নি। এ ব্যাপারে আমি মর্মাহত।   

অভাবেব সংসারে  ছেলে মেয়েরাও তেমন কিছু করতে পারেনি। অবজ্ঞা আর অবহেলায় বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত মাষ্টারকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে পরিবারটিকে সরকারী সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী সখিনা বেওয়া ও উভয় পক্ষের সন্তানদের।

বাংলাপত্রিকা/এসএস

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন