কুড়িগ্রামের আরডিসি নাজিম উদ্দিনের যত অপকর্ম

এসএম রফিকুল হক রফিক, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২০ | ০৫:৫৮:০২ পিএম
কুড়িগ্রামের আরডিসি নাজিম উদ্দিনের যত অপকর্ম
একে একে বেরিয়ে আসছে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিম উদ্দিনের অপকর্মের নানা কাহিনী। সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের মতোই একই কায়দায় মধ্যরাতে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে নির্যাতন ও হয়রানী করে আসছেন নাজিম উদ্দিন। তার হাতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে ভুক্তভোগী নির্যাতিতরা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে থাকেন।

বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে বাড়ী থেকে তুলে এনে নির্মম নির্যাতন করে ঐ রাতেই ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা দেয় আরডিসি নাজিম উদ্দিন। একই কায়দায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরীহ মানুষকে নানা অজুহাতে ধরে এনে ভ্রাম্যমান আদালতে জেল ও পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে বেশ কয়েকটি। নির্যাতিত এসব মানুষ তার এসব অপকর্মের শাস্তিসহ নিজেদের প্রতি সুবিচার চান সরকারের কাছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারী নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের পঞ্চায়েত পাড়ার কৃষক খালেকুজ্জামানের বাড়ীতে গভীর রাতে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে তান্ডব চালান নাজিম উদ্দিন। ঐ ইউনিয়নের দেবীকুড়া নামক বিল নিয়ে দ্বন্দের জেরে প্রতিপক্ষের যোগসাজসে খালেকুজ্জামানের বাড়ীতে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে দরজা, জানালা ভেঙ্গে তাকে টেনে হেচড়ে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন। এসময় তাদের বাধা দিতে গেলে তার স্ত্রী, সন্তান ও নাতিসহ পার্শ্ববর্তী অনেককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ পাড়াসহ লাঠি পেঠা করেন।

পরে কৃষক খালেকুজ্জামানকে গাড়িতে তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ধরে নিয়ে যান। পথিমধ্যে খালিকুজ্জামানের নিকট নিকট ২ লাখ টাকা দাবী করেন। অন্যথায় জেলে দেয়ার হুমকী দেন। সে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মধ্যরাতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নীচ তলায় একটি রুমে বসিয়ে ৬ মাসের জেল প্রদান করেন। বর্তমানে জামিনে রয়েছেন তিনি।

এদিকে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে আরডিসি নাজিম উদ্দিনের হাতে নির্যাতিত বিশ্বনাথের স্ত্রী, সন্তান ও তার ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবে এসে নির্যাতনের বর্ণনা দেন। কিছুদিন আগে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের একটি জলমহাল ইজারার ঘটনায় মৎস্যজীবি বিশ্বনাথকে একই কায়দায় মধ্যরাতে বাড়িতে গিয়ে ঘর থেকে বের করে কিল ঘুষি মেরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে এসে মোটা অংকের টাকা দাবী করে। টাকা দিতে না পাড়ায় তাকে দুই বছরের জেল প্রদান করা হয়। বিশ্বনাথ জেলে থাকলে এখন পর্যন্ত সে মামলার কোন কোন কপি হাতে পাননি বিশ্বনাথের পরিবার।

এব্যাপারে আরডিসি নাজিম উদ্দিনের হাতে জড়িত খালেকুজ্জামান মজনু জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা সময় হঠাৎ করে বাড়ির প্রত্যেকটি দরজার মধ্যে গুড়ি লাথ্যি শুরু হয়। এভাবে লাথ্যি মারতে মারতে একপর্যায়ে আমার ঘরের দরজা ভেঙ্গে আমাকে ঘর থেকে বের করে আনে। আমাকে বাইরে নিয়ে আসার পর আমি আরডিসি নাজিম উদ্দিনের কাছে জানতে চাই এতো পুলিশ নিয়ে এসেছেন কি আমার অপরাধ। কিন্তু সে কোন উত্তর না দিয়ে বলে একে এরেস্ট করো। তারপর দুইজন বিজিবি আমার দুই হাত দুই দিকে ধরে গাড়িতে তোলে। গাড়িতে তোলার পর আমার মাথায় যে টুপি ছিল সে টুপিটা খুলে ফেলে দেয়। এরপর অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর আমাকে বলে যে তোমার কাছে দুই লাখ টাকা আছে। যদি টাকা থাকে দেও তোমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাই। তখন আমি বললাম যে আমি টাকা কোথায় পাবো। আমার তো কোন টাকা পয়সা নাই, গরীব মানুষ। তারপর ডিসি অফিসের নীচ তালায় আমাকে নিয়ে গিয়ে ওখানে একটি রুমে বসিয়ে বলা হয় তোমাকে ৬ মাসের জেল দেয়া হয়েছে। কোন প্রধানমন্ত্রী তোমাকে বাঁচায় দেখা যাবে। এখন আমার কথা হলো আমি এর ন্যায় বিচার সরকারের চাই।

কৃষক খালেকুজ্জামানকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবারের সদস্যদেরকেও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। সে নির্যাতনের বর্ণনাও দেন তার স্ত্রী, নাতিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবে নির্যাতিত বিশ্বনাথের স্ত্রী পারো বালা দাস জানান, আমার স্বামীকে বাড়ি থেকে ধরে মারপিট করে জেলে দিয়েছে। আমার দুইটি ছোট সন্তান নিয়ে তাদের পা ধরলেও তারা ছেড়ে দেননি। এমনকি আমার ছোট ছোট বাচ্চা দুইটিকেও লাথ্যি লাথ্যি ফেলে দিয়েছে এই ম্যাজিস্ট্রেট। আমাকে গালি দিয়ে ঘরের দরজা ভেঙ্গে ফেলেছে। তারপর আমি তাকে বাপ দায় দিলেও তারা আমার স্বামীকে ছেড়ে দেননি। তখন আমাকে বুট জুতা দিয়ে লাথ্যি মারেন। প্রতিবেশিরা আসায় তাদেরকেও মারধর করেছে। আমি গরিব মানুষ কোথায় যাবো। আমার স্বামীকে ছেড়ে না দিলে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে কি খাব। আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়া হোক।

প্রেস ক্লাবে এসে ছোট ভাই বিশ্বনাথ নির্যাতনের বর্ণনা দেন তার বড় ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

এ ব্যাপারে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি জানান, ভ্রাম্যমান আদালতের নামে ভিতরবন্দ ইউনিয়নে অনেক সাধারন মানুষকে এভাবে হয়রানী করেছে আরডিসি নাজিম উদ্দিন। এসব ঘটনার সঠিক বিচার দাবী করেছেন তিনি।   

জেলা প্রশাসন অফিস সুত্রে জানা গেছে সিনিয়র সহকারী কমিশনার(আরডিসি) নাজিম উদ্দিন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যোগদান করেন ২৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে। রাজস্ব, এলএ, ব্যাবসা-বানিজ্য এবং আর এম শাখার দায়িত্ব পালন করেন করেন তিনি। যোগদানের পর থেকেই জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীনের নির্দেশে ভ্রাম্যমান আদালতের নামে বিভিন্ন অপকর্ম শুরু করেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন।

এছাড়া কক্সবাজার সদর উপজেলা ভুমি কমিশনার থাকাকালীন নানা অপকর্মে জড়িত থাকায় তাকে সেখান থেকে ষ্টান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। সেসময় তিনি কক্সবাজার শহরের কলাতলি এলাকার মোহাম্মদ আলী ওরফে নকু মাঝি(৬২)নামে এক বৃদ্ধকে নির্যাতন করার ভিডিও গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

অন্যদিকে শুধু প্রত্যাহার নয় জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির দাবীতে কুড়িগ্রামে মানব বন্ধন করেছে ছাত্র, যুব সমাজ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সংগঠন।

সোমবার কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এসব মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানব বন্ধনে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক, ছাত্র ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

বক্তারা বলেন, শুধু ডিসি বা আরডিসিসহ জড়িতদের প্রত্যাহার নয় মধ্যরাতে নিরপরাধ সাংবাদিককে তুলে এনে নির্যাতন ও মাদকের মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ঘটনায় সুষ্ঠ তদন্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

উল্লেখ্য গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পর জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট আনসার সদস্যদের নিয়ে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের শহরের চড়ুয়া পাড়ার বাড়িতে যায়। একপর্যায়ে জোড় পুর্বক দরজা ভেঙে তার ঘরে প্রবেশ করে তার স্ত্রী সন্তানের সামনেই তাকে মারধর করে ধরে নিয়ে আসে। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে এসে নির্যাতনের পর তার বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা রাখার অভিযোগে তাকে ১ বছরের কারাদন্ড দেয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ঘটনার একদিন পর জামিন পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অমানুষিক ও বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দেন নির্যাতিত সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম।

এদিকে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে নির্যাতনের ঘটনায় সোমবার জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিম উদ্দিনসহ দুই সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রনারয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করে নতুন প্রশাসক হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

বাংলাপত্রিকা/এসএস

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন