তৃণমূলে আস্থা হারাচ্ছে আ’লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | রাজনীতি
প্রকাশিত: রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০ | ০৩:২১:৫৩ পিএম
তৃণমূলে আস্থা হারাচ্ছে আ’লীগ
আস্তে আস্তে জাতীয় সংসদ-উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনোনয়ন পাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিতরা। আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতারা অর্থের বিনিময়ে সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার ২ সিটি নির্বাচনে দলীয় কাউন্সিলদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং স্থানীয় এমপিদের পাশে থেকে বিএনপির পন্থীদের সাথে আঁতাত করে তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যে দলের হাইকমান্ড এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলও শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতারা সাথে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রার্থীদের অভিযোগ, সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার ২ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের পরাজয়ের জন্য স্থানীয় এমপি, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে বিএনপির আতাঁতের ঘটনাই মূল কারণ। তবে দলের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতারা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চান না। তাদের ধারনা, বার বার মুখে ত্যাগীদের নিয়ে দলীয় হাইকমাণ্ড প্রশংসা করলেও বাস্তবে তাদের মূল্যায়ন করছেন না। ফলে ত্যাগী, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দলের প্রতি নিবেদিত, পদবঞ্চিত তৃণমূল আওয়ামী লীগ হাইকমাণ্ডের প্রতি দিন দিন আস্থা হারাচ্ছে। তৃণমূল নেতাদের তাদের ধারণা ছিল, দল ও সরকারে চলমান শুদ্ধি অভিযানের ফলে প্রকৃত নেতারা মূল্যায়িত হবেন।

কালোটাকা, পেশিশক্তি, ‘বড়ভাই’, গ্রুপবাজির মাধ্যমে পদপ্রাপ্তির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে। একইসাথে পদ হারানোর শঙ্কায় থাকবে টেন্ডার ও চাঁদাবাজ, অনুপ্রবেশকারী, দলের ভেতর অন্তর্দ্ব›দ্ব সৃষ্টিকারী, বিভিন্ন দুর্নীতিবজসহ ক্যাসিনো পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত নেতারা। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা)’ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বাস্তবায়নে মাঠের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। মাঠে বার বার অনুপ্রবেশকারি ও কালো টাকার মালিক-টেন্ডার ও চাঁদাবাজরাই দাপটের সাথে দলের সমর্থনে মনোনয়ন পেয়েছেন এবং নির্বাচিত হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের আর্শিবাদে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১২৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন ১৯টিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ১৮টি, বিএনপি ৯টি, জাতীয় পার্টি ২টি, ইসলামী আন্দোলন ১টিতে পাশ করেছে। সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডে ৩১টিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত, বিএনপি ৭টিতে, সতন্ত্র ৫টিতে বিজয়ী হয়েছেন। অনেক ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা পাশ করেছেন কিন্তু মেয়র প্রার্থীরা বিএনপির মেয়র প্রার্থীর চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। আবার অনেক ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অনেক বেশি ভোট পেলেও দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরা তার অর্ধেক ভোট পেয়েছেন।

আবার কিছু ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীর চেয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী অনেক বেশি ভোট পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের অভিযোগ, বিদ্রোহী প্রার্থীরা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ বিজয়ের জন্য দলের কাউন্সিলর প্রার্থীর বিপক্ষে তো কাজ করেছেনই, কিছু কিছু জায়গায় মেয়র প্রার্থীদের বিপক্ষেও কাজ করেছেন। বিএনপির প্রার্থীদের সাথে আতাঁত করে দলকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ যা গত নির্বাচনে প্রকাশ্য রুপ নিয়েছে। দলের হাইকমান্ড যদি এসব ঘটনার তদন্ত করে সুষ্ঠু ব্যবস্থা না নেয় তাহলে আওয়মী লীগের ভবিষ্যত রাজনীতি হুমকির মুখে পড়বে।

১২ নং ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উপ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মামুনুর রশিদ শুভ্র। ৫৩ নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নূর হোসেন পরাজয়ের পেছনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য সানজিদা খানমের ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির প্রার্থী মীর হোসেন মীরু কে সানজিদা খানম সমর্থন দিয়েছেন বলে এলাকায় ওপেন সিক্রেট ছিল। একই ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-৫ আসনে। ওই আসনে ৬১নংওয়ার্ডে বিএনপি নেতা জুম্মন বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা এবং তার পরিবারের সদস্যরা বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয়ায় নৌকার সমর্থন পাওয়া কাউন্সিলর প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছে। একইসাথে নৌকার মেয়রপ্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসও অনেক ভোট কম পেয়েছেন।

সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার মেঝো ছেলে বৃহত্তর ডেমরা থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহফুজুর রহমান মোল্লা শ্যামল প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে মাঠে ছিলেন। ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন শামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ৬৪, ৬৫, ৬৬ সংরক্ষিত আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইঞ্জি. মনিরা চৌধুরীকে মারধর করেছেন মাহফুজুর রহমান মোল্লা শ্যামল এমন অভিযোগ করেছেন মনিরা। এছাড়াও ডগাইর সিদ্দিকী আকবর (রা:) ও ডগাউর দারুননাজাত ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই নির্বাচনের দিন চড় থাপ্পড় দিয়েছেন প্রকাশ্যে। যা ব্যাপকভাবে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এলাকায়। ৪৯ নং ওয়ার্ডে বিএনপির প্রার্থী বাদল সরদার, ৬৬ নং ওয়ার্ডে জাতীয় পার্টির মতিন সাউদ, ৬৯ নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী সালাউদ্দিন আহমেদের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন এমপি পুত্র শ্যামল। তবে ৬০ নং ওয়ার্ডে লুৎফর রহমান রতন পরাজিত হওয়ায় সবাই খুশি।

৬১ নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহ আলম ধনিয়া এলাকার বড় বাড়ির যোগাযোগ রক্ষা করে নির্বাচন করায় পরাজিত হয়েছেন। বড় বাড়িতে চিহ্নিত পলাতক সন্ত্রাসীদের আখড়া। সন্ত্রাসীদের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোতে এলাকাবাসী আতঙ্কিত ছিল। তিনি পুরনো আওয়ামী লীগার হলেও পরাজিত হওয়ায় এলাকার আওয়ামী লীগ ও জনগণ খুশি। ৬৫ নং ওয়ার্ডে ত্যাগী আওয়ামী লীগের যুবলীগের নেতা হারুনর রশীদ। তবে তিনি এবারও দলের মনোনয়ন পাননি। এই ওয়ার্ডে একসময়ের আলোচিত ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা সামসুদ্দিন আহমেদ সেন্টুকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তিনি বিজয়ী হয়েছেন। ৬৯ নং ওয়ার্ডে হাবিবুর রহমান হাসু বিতর্কিত, চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। এখানে বিদ্রোহী সালাউদ্দিন আহমেদ পাশ করায় সবাই খুশি।

এছাড়া ২৮ নং ওয়ার্ডে মো. সালেহিন, ৩০ নং ওয়ার্ডে মোহাম্মদ হাসান, ৪৫ নং ওয়ার্ডে হেলেন আক্তার, ৪৭ নং ওয়ার্ডে নাসির আহমেদ ভূইয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের মেকানিজমে পরাজিত হয়েছেন।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটির ৪৮ নং ওয়ার্ড এ দলীয় মনোননয়ন পেয়েছিলেন দক্ষিণখান থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম মাসুদুজ্জামান মিঠু। কিন্তু ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের দুইজন নেতা, সাবেক মহানগর যুবলীগ নেতা ও খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কেরামত দেওয়ানের ষড়যন্ত্রের কারণে পরাজিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মিঠু।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এই হেভিওয়েট নেতারা কেউ তার জন্য কাজ তো করেননি বরং বিএনপি বিজয়ী প্রার্থী আলী আকবর আলীর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নৌকা ভোট পেয়েছে ৯৩০০ আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আমি পেয়েছি ৬ হাজার দুইশো’র কিছু বেশি। বড়–য়ায় তিনটি কেন্দ্রে নৌকা ভোট পেয়েছে ২ হাজার সাতশো’র বেশি, ধানের শীষ ভোট পেয়েছে ১১৫৭। আর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ২১৪৬টি, আমি ভোট পেয়েছি ১১৯৭টি। নৌকা যদি এতো বেশি ভোট পায় তাহলে নৌকার প্রার্থী হিসেবে আমি প্রায় ষোল’শ ভোট কম পেলাম কিভাবে। আমাদের দলের নেতারা বিএনপির সাথে আতাত না করলে এমনটা কখনো হতো না। মিঠু আরো বলেন, খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কেরামত আলী দেওয়ান আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়েছেন আর বলেছেন শেখ হাসিনা যা বলবে তা কী সব শুনতে হবে নাকি? দন কেরামত আলী দেওয়ান। এর পর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ভোট নেয়া হয়।

৪৯ নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান নাঈমের কাছে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত সফিউদ্দিন মোল্লা পনু।

তিনি বলেন, স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগের সভঅপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাড. সাহারা খাতুন প্রকাশ্যে নাঈমের পক্ষে কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ডেকে ডেকে নাঈমের পক্ষে কাজ করার জন্য বলেছেন। এছাড়া ৩ নং ওয়ার্ডে জিন্নাত আলী মাদবর, ৬ নং ওয়ার্ডে সালাউদ্দিন রবিন, ১৪ নং ওয়ার্ডে মইজুদ্দিন, ৩১ নং ওয়ার্ডে আলেয়া সারোয়ার ডেইজি, ৪১ নং ওয়ার্ডে আব্দুল মতিন, ৪২ নং ওয়ার্ডে জাহাঙ্গীর আলম পরাজিত হয়েছেন।

বাংলাপত্রিকা/এসএস

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন