৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা অভয়নগরের শমশের আলী খান

মোঃ মিজানুর রহমান, অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি | সাক্ষাৎকার
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০১:২১:০৬ এএম
৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা অভয়নগরের শমশের আলী খান
অভয়নগর উপজেলার যে কয়জন মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারমধ্যে অন্যতম বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ শমশের আলী খান (গেজেট নং-২১৭৮)। অভয়নগর উপজেলার ৫ নং শ্রীধরপুর ইউনিয়নের দেয়াপাড়া গ্রামে এম সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মরহুম মকরম আলী খাঁন ও মাতা সুফিয়া বেগম। যশোর জেলার ৮ নং সেক্টর কমান্ডার মোঃ নাজমুল হুদার অধিনে তিনি যুদ্ধ করেন। ভারতের বিহারে চাকুলিয়া ক্যাম্পে ও জয়বাংলা যুবশিবিরে (মুজিবনগর) আনোয়ার সাহেবের নিকট প্রশিক্ষন নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য জীবন বাজি রেখে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত ও অসংখ্যা মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এর সমাপ্তি ঘরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে।আমাদের এই উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ছিল পরাধীন। ফলে এই অঞ্চলে সামাজিক জাগরণ এবং শিক্ষা দীক্ষার তেমন প্রসার ঘটেনি। সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরুপ পরিস্তিতি, অসম আর্থিক বন্টান ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানীদের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমবনতির চুড়ান্ত। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশের নামক রাষ্ট্রে পরিচিত এক গৌরবময় বিজয়গাঁথা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এমনই এক মুক্তিযোদ্ধার জীবন সর্ম্পকে আলোকপাত করা হলো-

বাংলা পত্রিকাঃ আপনি কিভাবে জানলেন যে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময় এসেছে ?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
যখন দেখলাম এলাকাতে হানাদার বাহিনীর আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে, তখনই বুঝলাম যে আমাদের এই বয়সই হল দেশকে শত্রু মুক্ত করার বয়স। আর বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭মার্চের ভাষনেই যখন বলেছেন শত্রু পক্ষ দেশে ঢুকে পড়েছে, আপনাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে, তখনই বুঝেছিলাম আমাদের আর রক্ষা নেই, কিছু একটা হবেই।

বাংলাপত্রিকাঃ আপনার তখন বয়স কত ছিল?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র, তখন বয়স ১৮-১৯ বছর।

বাংলাপত্রিকা: অপনি কখন যুদ্ধে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন সেটা কোন সময় ছিল?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান :
সেটা এপ্রিলের শেষের দিকে হবে, আমার বন্ধুর পরামর্শে আমি স্থির করি যে আমাকে যুদ্ধে যেতেই হবে।

বাংলাপত্রিকাঃ তিনি কে ছিলেন?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
তারা আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু মুজিবর রহমান মোল্যা এবং মোঃ ইসহাক আলী মোল্যা নামের এক মুক্তিযোদ্ধা আমাকে পরামর্শ দেন যে এটা হল উপযুক্ত বয়স দেশ বাঁচবার। তাই তাদেরই পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিলাম।

বাংলাপত্রিকা: বঙ্গবন্ধুর ডাক কখন পেলেন? আপনারা কি তখন আওয়ামীলীগ করতেন?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান: 
বঙ্গবন্ধু তো ৭ ই মার্চের ভাষনে সবই বলেছেন, যদিও আমি ৭ ই মার্চের ভাষণ সারাসরি শুনতে পারিনি কিন্তু ৮ ই মার্চ সকাল থেকেই রেডিওতে বেশ কয়েকবার জানানো হয়। আমি তখন শুনেছি। আর বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়াদিতে শুধু আওয়ামীলীগ করতে হবে কেন? তিনিতো বাংলার নেতা ছিলেন। যা বলতেন বাঙালী সেটাকেই বেদ বাক্য মনে করতো। এখনকার নেতাদের মতো তিনি আস্থাহীন ছিলেন না।

বাংলাপত্রিকা : মুক্তিযুদ্ধ কি রাজনৈতিক ছিল?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
আমার বয়স তখন সবে ১৮-১৯, আমরা রাজনীতি এতটা বুঝতাম না, শুধু আমরা কিছু নেতাদের জানতাম যারা নেতৃত্ব দিন। খবরে, পেপারে, রেডিওতে তাদের নাম শুনতাম। তখন টিভি ত এত ছিল না, গ্রামে থাকি এখানে টিভি নেই বল্লেই চলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম শুনতেই মানুষ পাগল হয়ে যেত। শেখ সাহেব নামেই তিনি পরিচয় ছিল তার। সবাই বলতেন শেখ সাহেব কি বলেছেন, বা কি করেছেন। ৭০ এর নির্বাচনে আমার মা বাবারা তথা আমরা বাঙালীরা ভোট দিলাম তারাতো মানল না। তারপরই বুঝতে আর বাকিনেই যে একটা কিছু ঘটবেই। যা হোক মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যই রাজনৈতিক ছিল তবে যারা অরাজনৈতিক যেমন আমি তারাও রাজনৈতিক নেতাদের ডাকে সাড়া দিল।

বাংলাপত্রিকা: মুক্তিযুদ্ধের ট্রেইনিং কোথায় করেছেন?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
ভারতের বিহারে চাকুলিয়া ক্যাম্পে ও জয়বাংলা যুবশিবিরে (মুজিবনগর) আনোয়ার সাহেবের নিকট প্রশিক্ষন মোট একমাস।

বাংলাপত্রিকা: আপনি কত নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন ?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
আমি ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছি।
 
বাংলাপত্রিকা: কোন কোন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
প্রথমে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ঢুকলাম। সেখানে মরণপণ যুদ্ধ করতে হল। বাঁচব নাকি মারা যাব এমন অবস্থা, আমরা তো জীবনের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। সেখানে খুলনার শুকুর আলী ও মহেশপুরের বাচ্চু মিয়া আমার পাশেই ছিলেন। পুরাদিন নাখেয়ে শুধু অস্ত্র সামনে রেখে যুদ্ধ করেছি। সেখানে বহু হতাহত হল। তাদের সবার নাম আমি জানিও না। সেই স্থানে দীর্ঘ অভিযান চালানোর পর বাঙ্কার দখল নেয়া হল। সেই বাঙ্কারটা ছিল বিশাল। তারা এটা সেই সময়ের বর্ডার সিকিউরিটির বাঙ্কার ব্যবহার করেছিল। সেই বাঙ্কারের ভেতরে পাথরের ঢালাই দেয়া ছিল। এর বিশালতা অনেক। আনেকেই ভেতরে প্রবেশ করলেন কিন্তু আমি ভেরতে যায় নি।

বাংলাপত্রিকা: মুক্তিযুদ্ধে আপনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
পুরো মুক্তিযুদ্ধটাই আমাদের অভিজ্ঞতা। আমাদের খুব সতর্ক হয়ে যুদ্ধ করতে হতো, কারণ সামনে পাক আর্মি পেছনে মিত্র বাহিনী।

বাংলাপত্রিকা: আপনারা কিভাবে বুঝাবেন পাকিস্থানি সৈন্যের সাথে আপনারা যুদ্ধ করে জিততে পারবেন? কেননা তারা ত ট্রেনিং প্রাপ্ত ছিল।
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
ঐ সময়ে এতকিছু ভয় ছিল না, হয় মরব না হয় মারবো এমন চিন্তা মনে কাজ করতো। আর ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের ট্রেনিং দেখে খুব সাহস দিন। বলতো আমরা যা শিক্ষা দিলাম তার সঠিক প্রয়োগ করলে কেই মরবেনা।  তারা যখন আমাদের অস্ত্রদিয়ে বিদাই দিল, মনে হয় যেন আপন ভাই তারা। মেজর কর্ণেল আর বড় বড় অফিসারের এসে জড়িয়ে ধরে কেদে বুক ভাসাতো। আর বলতো যাও তিনি সহায় আছেন তোমোর বিজয় আসবেই।

বাংলাপত্রিকা: পাকিস্থানি সেনা আর আপনাদের যুদ্ধের কৌশলে কি পার্থক্য ছিল?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
তারা খান সেনা, তাদের যুদ্ধের রণ কৌশল দেখাযেতো তারা দুই হাতেই অস্ত্রধরে ফায়ারিং করতো। আর আমরা একহাতে আমাদের অস্ত্রছিল রাশিয়ান, আর ওদের চায়না অস্ত্র। তবে ভারতীয় সেনারাও দূর্দান্ত। তাইতো জয় সহজ হয়েছে।

বাংলাপত্রিকা: আপনার জীবনের শেষ সময়ে তরুন প্রজন্মের কাছে চাওয়া কি?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
বর্তমান তরুন প্রজন্মের কাছে আমার একটিই চাওয়া বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে স্থান করে নিতে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে এবং মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গরার লক্ষ্যে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

বাংলাপত্রিকা: আপনার জীবনের সর্বশ্রেষ্ট পাওয়া কি ?
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি হিসাবে মহাকাল হাই স্কুলে অধ্যায়নরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর প্রদেয় ৫ শত টাকার চেক পাওয়ার পর আমি অভিভূত হয়ে পড়ি, এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ট পাওয়া।
     
বাংলাপত্রিকা:   আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী খান:
বাংলা পত্রিকাকেও ধন্যবাদ, এই পত্রিকার উত্তোরোত্তর সাফল্য ও কল্যান কামনা করছি।

বাংলাপত্রিকা/এসআর

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন