নদী ড্রেজিংয়ের অর্ডার স্থানীয় প্রশাসনের রক্ষাকবচ

রুবেল দাশ, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ০৩:০৬:৩১ পিএম
নদী ড্রেজিংয়ের অর্ডার স্থানীয় প্রশাসনের রক্ষাকবচ
সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা আহম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বাজালিয়া ভোর বাজার এলাকায় সাঙ্গু নদীর প্রবল ভাঙ্গনপ্রবণ স্থানে বালু উত্তোলনের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন বসান তিনি। এ কাজে তার সহযোগী হিসেবে একটি সিন্ডিকেটও কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘদিন বাজালিয়া এলাকা সাঙ্গু নদীর তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়ে শত শত বসতঘর, ভিটে, মসজিদ মাদ্রাসা, মন্দির ও ফসলি জমিসহ বহু স্থাপনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙ্গনে ভিটে বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। আবার অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

নদী ভাঙ্গন থেকে এ এলাকার মানুষকে রক্ষা করার জন্য বর্তমান সরকার শত কোটি টাকা ব্যয় করে সিসি ব্লকের প্রতিরোধ বাধ নির্মাণ করে এলাকাবাসিকে শঙ্কামুক্ত করেছে। যদি এ ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধের নীচ থেকে বালু উত্তোলন করা হয় তাহলে নদী গভীর হয়ে বাধ ধ্বসে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

গত মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে যুবলীগের ওই নেতা বাজালিয়ার ওই স্থানে ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধ ঘেঁষে নদীর তলদেশ হতে বালু উত্তোলনে ড্রেজার মেশিন বসানো হলে ভাঙ্গন পীড়িত এলাকাবাসি তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং যুবলীগ নেতা আহম্মদ হোসেনের অপতৎপরতা বন্ধের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর এলাকাবাসির গণস্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদন করে।

এলাকাবাসির অভিযোগ, নদী ড্রেজিংয়ের অর্ডার স্থানীয় প্রশাসন এবং বালু খেকো সিন্ডিকেটের একটি রক্ষাকবচ। উপজেলার কালিয়াইশ, ধর্মপুর, বাজালিয়া ও আমিলাইষসহ অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ভাঙ্গিয়ে জনপ্রতিনিধি, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত। সিসি ব্লকের গা ঘেঁষে নদীর তলদেশ হতে বালু উত্তোলন করলে সরকারের শত কোটি টাকার ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধ অচিরেই ধ্বসে পড়বে।  

বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তাপস দত্ত বলেন, জনপ্রতিনিধিরা এলাকার জনহিতকর কার্যকলাপের পক্ষে অবস্থান নেন। এলাকার জনক্ষতিকর বিষয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমারও কাম্য নয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার সাহা বলেন, ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধের ব্লকের নীচ থেকে বালু উঠানো হলে ব্লক ধ্বসে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়া বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের করার কিছু থাকে না। স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

জানা যায়, দোহাজারী হতে কক্সবাজার হয়ে গুমধুম পর্যন্ত রেললাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকশন এন্ড কোং লিঃ এর বালু সরবরাহকারী হিসেবে কাজ নেন বান্দরবান জেলা যুবলীগ নেতা আহম্মদ হোসেন। আহম্মদ হোসেন বান্দরবান জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক। গত এক মাস আগে ব্যর্থ নেতা হিসেবে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। বালু সরবরাহের কাজ পাওয়ার পর থেকে এ যুবলীগ নেতা বাজালিয়া ভোর বাজার এলাকায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধের গা ঘেঁষে উচ্চ অশ্বশক্তির ড্রেজার মেশিন বসিয়ে সাঙ্গু নদী হতে বালু উত্তোলনের পাঁয়াতার শুরু করেছেন।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি খুব কষ্ট করে আমার নির্বাচনি এলাকায় নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ বাধ দিয়েছি। এসব বালু খেকো বদমায়েশদের জন্য সব শেষ হতে বসেছে। সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে যারা বালু উত্তোলন করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

এ ব্যাপারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে যুবলীগ নেতা আহম্মদ হোসেন সাঙ্গু থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রেল লাইন নির্মানের ঠিকারদারী প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকশনের বালু সরবরাহের কাজ আমি পেয়েছি। যার কারনে সাঙ্গু নদী হতে বালু উত্তোলন করার জন্য ড্রেজার মেশিন বসিয়েছি। আমাদের কাছে নদী ড্রেজিংয়ের অর্ডার আছে। নদী ড্রেজিং এর মাধ্যমে ভরাট নদী খননের কিছু সরকারি প্রক্রিয়া রয়েছে তা’ করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।

বান্দরবান জেলা প্রাক্তন সিভিল সার্জন ও এলাকার নদী ভাঙ্গন পীড়িত বাসিন্দা ডা. মংতেঝ বলেন, বিগত দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে এ এলাকা সাঙ্গু নদীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বহু বাড়িঘর বসতভিটেসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সরকারি বেসরকারি কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্ধু-বান্ধব ও এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ২০১২ সালে বালি ও সিমেন্ট মেশানো বস্তা দিয়ে ভাঙ্গন প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে তা তলিয়ে যায়।

যোগাযোগ করা হলে বাজালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ বলেন, আমি যতটুকু জানি রেলওয়ের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকশন তাদেরকে বালু উত্তোলনের অর্ডার দিয়েছে। তাছাড়া এলাকার কিছু লোকের ভিটে ভরাট করে দেয়ার শর্তে তারা সাঙ্গু থেকে বালু উত্তোলন করবে। আমার চেয়ে বেশি জানবেন এবং বলতে পারবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
    
এ ব্যাপারে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে মোবাইলে ফোন দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

বাংলাপত্রিকা/আইউ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন