আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর সিডর দিবস

পারভেজ শাহরিয়ার, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি | সারাদেশ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১১:৫৬:২০ এএম
আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর সিডর দিবস
শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) ভয়াল সিডরের ১২তম বার্ষিকী।

স্মরণাতীত কালের মধ্যে সবচেয়ে স্বল্পক্ষণ স্থায়ী অথচ সবচেয়ে ভয়ংকর, শক্তিশালী ও প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বরের ‘সিডর’ নামীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। সিডর একটি সিংহলী শব্দ, যার অর্থ চোখ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হারিকেনের তীব্র ক্ষমতাসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটি দেখতে অনেকটা মানুষের চোখের মত হওয়ায় সিংহলী ভাষায় এর নামকরণ করা হয় ‘সিডর’। ভয়াবহ সেদিনের ১১ বছর অতিবাহিত হলেও আজও সে দুর্বিসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলের মানুষদের।

সেই দুঃখসহ স্মৃতি যা আজ ভুলতে পারেনি স্থানীয় মানুষ। এ দিনে উপকূলের লাখো মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল। ঘটেছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি। স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। বিধ্বস্ত হয় মানুষের বসতবাড়ি, ফসলের ক্ষেত। ভয়াবহ বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, নৌ, বিদ্যুৎ এবং টেলিযোগাযোগসহ আধুনিক সভ্যতার সার্বিক অবকাঠামো। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রকৃতির এ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখে শিউরে ওঠে গোটা বিশ্ব। সাহায্যের হাত বাড়ায় দেশি-বিদেশিরা।

বেশ কয়েকদিন ধরেই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল। ঝড়ের পূর্বদিন থেকেই মহাবিপদ-সংকেত ১০ নম্বরে উঠে যায়। ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে হালকা বৃষ্টি। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যায় হালকা বাতাস। রাত ৯টা থেকে আমতলীসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় প্রচন্ড বেগে ঝড়ো হাওয়া আঘাত হানে। সাগর ফুঁসে ওঠে। রাত সাড়ে ৯টায় ঘূর্ণিঝড়টি বলেশ্বর নদী অতিক্রম করে বরগুনা জেলার উপর দিয়ে দেশের স্থল সীমায় প্রবেশ করে।

এ সময় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটি ছিল পাথরঘাটায়। ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২০-২৪০ কিলোমিটার। রাত ১০টায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের তান্ডব শুরু হয়। এ সময়ে ফুঁসে ওঠা সাগরের পানি ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় প্রচন্ড শক্তি নিয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ে। উপকূলীয় ভেড়িবাঁধে বাধা প্রাপ্ত হয়ে বিশখালী ও বুড়িশ্বর নদী দিয়ে তীরবর্তী আশার চর, নিদ্রা, ছকিনা, ফকিরহাট, তেঁতুলবাড়িয়া, সওদাগরপাড়া, তালতলী, জয়ালভাঙ্গা, গুলিশাখালীসহ আমতলীর ব্যাপক এলাকার ভেড়িবাঁধের বাইরের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগিসহ শত-সহস্র মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পানি আমতলী শহর রক্ষা বাঁধ উপচে এবং শহরের উত্তর পাশের আমতলী নদীর বাঁধ ভেঙ্গে চলে আসে শহরের মধ্যে। ২-৩ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় আমতলী শহর। রাত ৯টা থেকে ১১টায় এই ২ ঘণ্টার মধ্যে শুরু এবং শেষ। মধ্যবর্তী সময়ে পানির একটি মাত্র প্রচন্ড ধাক্কা। স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমতলীসহ উপকূলের সমগ্র এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে ধ্বংস তূপে পরিণত হয়। নিহত হয় ২৯৭ জন, নিখোঁজ ৪৯ জন এবং আহত ২৫০০ জন।

আমতলী ফেরিঘাটের পন্টুন, নোঙ্গর করা ২টি ফেরি তিতকাটা চরে, লঞ্চঘাটের পন্টুন পার্শ্ববর্তী ওয়াপদার বাইরের চরে উঠে যায়। নদী ও সমুদ্রে ডুবে যায় ৩৩৮টি ট্রলার। এই সিডরের আঘাতে শুধু আমতলীই নয়, উপকূলীয় ১৫টি জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
 
সিডর চলে গেলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল প্রায় দেড় মাস। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল একমাস। দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থারাও যোগাযোগ না থাকার কারণে সঠিক সময় ত্রাণসহ সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারেনি। দীর্ঘ এগারো বছর অতিবাহিত হলেও অনেকে হারানো স্বজনদের এখনো ফিরে পায়নি। অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। প্রতিবছর উপকূলের মানুষ এ দিনটিকে সিডর দিবস হিসেবে পালন করে।

১৫ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে সংঘটিত সিডরের মাত্র ৭ দিনের মাথায় ২২ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমতলী শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, জলোচ্ছাসে বরগুনা শহর ডুবে গেছে। পানি ধেয়ে আসছে আমতলীর দিকে। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে, আমতলী শহর ডুবে গেছে। আকস্মিক গুজবে আতংকিত শহর-বন্দর-গ্রামবাসী বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটোছুটি করছে।

আমতলীতে বেড়াতে আসা জনৈকা মহিলা আমতলী হাসপাতাল কোয়ার্টারের (৪তলা) ছাদে উঠে তার আত্মীয়-স্বজনদের মোবাইল ফোনে বলছে, ‘বাবারা আমার ওপর থেকে দাবি-দাওয়া ছেড়ে দিয়, ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর, আমি জলে ডুবে গেলাম’।

চলাভাঙ্গা গ্রামের জনৈকা মহিলা সদ্য প্রসূত বাচ্চা কোলে তুলে নেয়ার পরিবর্তে কাঁথা-কাপড়সহ কোল-বালিশ বুকে আগলে অনেক দূর গিয়ে সম্বিত ফিরে পান। এমনি গুজবে অসংখ্য মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। বরগুনা, পটুয়াখালী, বাগেরহাটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কয়েক জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বরগুনার একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে এই গুজব বা আতংক ছড়িয়েছে। গুজবটি সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল।
 
প্রবীন সাংবাদিক ও লেখক মুনশি আনোয়ার জানান, পাকিস্তান আমলের সর্বশেষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। ১১ ও ১২ নভেম্বরের এই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস ছিল এ এলাকার ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়-বিদারক অধ্যায়। ১৫৮৪, ১৮২২, ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ঝড়কেও ছাড়িয়ে যায় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ঝড়। হাজার বছর ধরে এ এলাকার লাখ লাখ মানুষ বঙ্গোপসাগরের লোনাজলে প্রাণ দিয়েছে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের সাথেই জলোচ্ছাস লোকজনকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্রগর্ভে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের এই ঝড়ে আমতলীর প্রায় ১০ হাজার (৯,২২৩ জন) লোক প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের পর ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ংকর, শক্তিশালী ও প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বাংলাপত্রিকা/এসএ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন