জামালপুরে ব্যাটারি রিকশার রাজত্ব, যানজট নিরসনে নিরব প্রশাসন

শাকিল আহমেদ, জামালপুর জেলা প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর ২০১৯ | ০৮:৩৭:৪৫ পিএম
জামালপুরে ব্যাটারি রিকশার রাজত্ব, যানজট নিরসনে নিরব প্রশাসন
জামালপুর পৌর শহরের প্রধান সড়কে এখন রাজত্ব চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশার। তার কোনটি সনাতন রিকশার মোটর সংযোজন করা, কোনটি স্টিল বড়ি রিকশা, আর কোনটি অটোরিকশার আদলে ইঞ্জিন বাইক। দিনে দিনে বেড়ে শহরে সয়লাব এসব অনুমোদনহীন রিকশায়। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে এসকল রিকশা চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কিছু অসাধু পৌর কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক নেতা ও কিছু অসাধু পুলিশের ছত্রছায়ায় দেদারছে চলছে এ সকল রিকশা। দ্রুতগতির এসব হালকা বাহনে কারণে ঘটছে ছোট-বড় নানা দূর্ঘটনা। রিকশা লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্রেনিংবিহীন অটোরিকশা চালকের ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে গেছে বহুগুণে। সম্প্রতি শহরের প্রধান সড়ক ছাড়াও পাড়া-মহল্লার ছোট-বড় সব গলিতে ছুটছে উচ্চস্বরে হরণ বাজাতে বাজাতে এ সকল রিকশা। পুরোনো আমলের অনেক অনুমোদিত পায়েচালিত রিকশা কোনঠাসা হয়ে পরেছে এসব অটোরিকশার দাপটে। জামালপুর শহরে এসব অটো রিকশার কোন পরিসংখ্যান নেই। এছাড়াও সিএনজি, নসিমন, করিমন, মাহিন্দ্র ট্রাক্টর, ট্রাক-বাস, প্রাইভেটকারসহ নানা গাড়ি চলছে শহরের প্রধান সড়কে। জামালপুর পৌরসভা প্রথম শ্রেণীর একটি পৌরসভা অথচ এর প্রধান সড়কে দেদারছে চলছে নছিমন, করিমন নামে স্যালোম্যাশিনচালিত কিছু গাড়ি। যে সকল গাড়ির কোন বৈধ কাগজ পত্র নেই, নেই কোন অনুমোদন। সে সকল গাড়ি থেকে কিছু কিছু অসৎ ট্রাফিক পুলিশ ২০ থেকে ৩শত টাকার বিনিময়ে শহরে প্রবেশ করাচ্ছে এ অবৈধ যানবাহন।

সূত্রে জানা গেছে, কিছু অসৎ পৌর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা শহরে দিন দিন বেড়েই চলছে। ট্রাফিক পুলিশ প্রশাসনের কিছু দুষ্ট সদস্যরা যানজট নিরসনের নামে রাস্তায় কর্মরত থাকলেও এদের মূল টার্গেট থাকে কখন কোন গাড়ি থেকে টাকা আদায় করা যায়। তাছাড়াও এরা কর্তব্য অবহেলা করে বিভিন্ন দোকানপাটে আড্ডা জমায়। ট্রাফিক পুলিশের দূর্ণীতির সুযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিসহ বিভিন্ন প্রকার মোটর যান নিজ নিজ ইচ্ছায় এক রাস্তায় দুই তিন লাইন করে চলে সব সময়। শহরের প্রতিটি গুরুত্ব পূর্ণস্থানে এবং মোড়ে অবৈধ সিএনজি, অটোরিকশা স্ট্যান্ড স্থাপন করেছে গাড়ির ড্রাইভারগণ। ফলে যানজট বেড়ে গেছে বহুগুণে।

কিছুদিন পূর্বেও শহরের গেইট পাড় এলাকায় শুধু যানজট দেখা গেছে। বর্তমানে পুরো শহর জুরেই যানজটে দূর্ভোগপোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। সাধারণ মানুষের কষ্টলাগবে যানজট নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পরিমান অটোরিকশার লাইসেন্স প্রদান করেছেন। শহরে যানজট নিরসনে এ সকল গাড়িতে দুই রং এর কালার লাগানো হয়েছে। একদিন পর পর এক এক রং এর অটোরিকশা চলবে শহরে। অথচ প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে দুই রং এর গাড়ি এক সাথে চলতে। জেলা বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা অটোরিকশা গুলো মোটা অংঙ্কের টাকার বিনিময়ে শহরে প্রবেশ করাচ্ছে অটোশ্রমিক কল্যাণ সমিতির কিছু কিছু অসাধু ব্যক্তি। ফলে তারা ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেনা। শহরে লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা বানিজ্য করে বিভিন্ন নামের অন্তত অর্ধশতাধিক স্থানে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। এদের অর্থ দূর্ণীতির কারণে অটোরিকশার ড্রাইভারগণ যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ টাকা ভাড়া ১০ টাকা নিচ্ছে অনেক যাত্রী অভিযোগ করে জানান। বেশি মোনাফা লাভের আশায শহরে বেড়ে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে শহরে পায়েচালিত বৈধ রিকশার চেয়ে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশার পরিমান কয়েক গুণ বেশী। সাম্প্রতিক ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপটে বৈধ পায়েচালিত রিকশা শহরে কমে গেছে। আবার অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণ করছে যে সংগঠনগুলো তাদের বানিজ্যেও বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে হলে নির্দিষ্ট স্থান থেকে একটি টোকেন নিতে হয়। এ জন্য গুনতে হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা। এই টোকেনের মেয়াদ ৮ ঘন্টা। এর পর পরের সময়ের জন্য নতুন টোকেন। টোকেন ছাড়া রিকশা নিয়ে বের হলে তা আটকে দেয় স্থানীয় রিকশা সংগঠনগুলি।

এক রিকশা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি সাধারণ রিকশা তৈরিতে খরচ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এরপর লাইসেন্স নিতে খরচ হয় কয়েক হাজার টাকা। অথচ অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরিতে খরচ হয় ২৫ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। এদের লাইসেন্সও নাই কোন বৈধতাও নাই। পাশাপাশি এ সকল গাড়ি চার্জ করতে বিদ্যুৎ অপচয় হয়। বেশি লাভ হওয়ায় এখন আর পায়েচালানো রিকশার ব্যবসা তেমন নেই আমাদের। তিনি আরো বলেন, এ সকল অটোরিকশার সবচেয়ে ভীতিকর দিক হলো দ্রুত ছুটে চলা। দ্রুতগতির কারণে মানুষও এসব বাহনে চলছে বেশি। আর তাতে ক্ষতির মূখে পরছে অনেকেই। শিশু-কিশোররদেরও দেখা যায় এসব রিকশা চালাতে। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়না বলে যে কেউ যখন-তখন নেমে পরে ব্যাটারি রিকশা নিয়ে। আর মোটরগাড়ি পেয়ে অল্পবয়সী চালকরা বাউলি কেটে ছুটে চলে অটোরিকশা এখান থেকে সেখানে। ফলে দূর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়তই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের এক বাইক চালক বলেন, আমি শহর দিয়ে বাইক নিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে বাস-ট্রাক নিয়ে যতটা চিন্তায় থাকি, তার চাইতে বেশি চিন্তা হয় এই রিকশা নিয়ে। এরা খুব দ্রুত চলে। হুটহাট পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় ঘেঁষে আসে। এলাকার সরু রাস্তার মধ্যে এরা যেভাবে চলে, তা খুব ভয়ানক। কিছুদিন আগে ডিসি অফিস ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় সামনে ব্যাটারি চালিত রিকশা দূর্ঘটনায় জামালপুর আইনজীবি সমিতির বিজ্ঞ এক প্রবীণ সদস্য মৃত্যুবরণ করেন। শহরের বিভিন্ন সড়কে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দূর্ঘটনা। পথচারীদের উপর রিকশা তুলে দেয়ার পাশাপাশি অন্য গাড়ি ও রিকশার সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও হর-হামেশাই ঘটাছে এই অটোরিকশা। যাত্রী উঠাতে যে খানে সে খানে দাঁড় করাচ্ছে অটোরিকশা। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে রাস্তার মধ্যতেই হুট হাট গুড়িয়ে ফেলছে অটোরিকশা।   

অপরদিকে বেশি মুনাফা লাভের আশায় শহরে বেড়ে গেছে অটোকিশা বিক্রয় কেন্দ্র। লাইসেন্স ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বিহীন অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অটোরিকশা বিক্রি করছে। কিছুদিন পূর্বে যে ব্যাটারিচালিত রিকশা একজন ব্যক্তি কিনতে পারতেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। ক্রেতার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে এর মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৭০ হাজারে। আর লাইসেন্স ও অনুমোদন নেওয়া ছাড়াই এসকল গাড়ি শহরে চালানো সম্ভব বলে হুহু করে বেড়ে গেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট।

সাধারণ মানুষ অভিযোগ করে বলেন, অসৎ কিছু পৌর কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়, তারাই অনুমোতি দিয়ে রাখছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচেতন ব্যক্তি। কিছুদিন পূর্বে জামালপুর পৌর কর্তৃপক্ষ শহরের যানজট  নিরসনে অটোরিকশার লাইসেন্স ও গাড়ির রং করিয়েছে। তাতে কোন ফল আসেনি। যানজট দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছেনা বলে জানান তারা।
এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কোন কার্যকর পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছেনা বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিং এর প্রতিটি সভায় সুধীমহলের অনেক প্রতিনিধি এ সকল ব্যাটারিচালিত রিকশা ও যানজট নিয়ে  কথা বললেও বাস্তবে তার কোন ফল মেলেনি শহরের যানজট নিরসনে। এ যেন দেখেও দেখার কেউ নেই। যানজট নিরসনই সবার কাম্য।

বাংলাপত্রিকা/এসআর

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন