মামলার চক্রের গ্যাঁরাকলে জালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি পরিবার

আশেক মান্নান হিমেল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৩৪:২০ পিএম
মামলার চক্রের গ্যাঁরাকলে জালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি পরিবার
মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরী। বাংলাদেশ মেরিন একাডেমীর ৪৩তম ব্যাচ থেকে ২০০৮ সালে ডিগ্রী শেষে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক ও শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট গুণাবলী স্বর্ণপদক লাভ করেন। একই ক্যাডেট দুটি স্বর্ণপদক পেয়ে বিরল সম্মান অর্জনকারী সোহেল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ শিপিং কোম্পানীতে ক্যাডেট হিসাবে যোগদান শেষে বর্তমানে ‘চীফ অফিসার’ পদে কর্মরত আছেন।

বিয়ের পর শ্বশুর কামাল মিয়া ও  ‘রাজারবাগ পীরের মামলা  চক্রে’র বেড়াজালে পড়ে বাড়িছাড়া হয়ে মাকে নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মামলার গ্যাড়াকলে ফেলে শ্বশুর কামাল  শহরের উত্তর মৌড়াইলের বাসিন্দা জামাতা সোহেলের বাড়িঘর দখল করে নিয়েছে।
 
মামলাবাজ চক্র এবং কামাল মিয়ার অত্যাচার থেকে রক্ষা ও নিজ বাড়িতে ফিরতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরী।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর ‘মামলাবাজ চক্র থেকে মুক্তি চাই’ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার নয়নপুর গ্রামের আবু জাহের মো. রেজা চৌধুরী ও রেহানা বেগমের একমাত্র সন্তান-মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরী। একই অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ সুপারের বরাবরও আবেদন করেছেন।

দাখিলকৃত অভিযোগে জানা যায়, সোহেল চৌধুরী জন্মের তিনদিনের মাথায় বিদেশে নিখোঁজ হন তার পিতা আবু জাহের মো. রেজা চৌধুরী। আজও মিলেনি তার হদিস। একমাত্র শিশু সন্তানকে অবলম্বন করে জীবনের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে মা রেহানা বেগম তার পুত্রকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ার ব্রত নেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যলেন্টপুলে বৃত্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখা সোহেল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমীর ৪৩তম ব্যাচে বিএমএস ডিগ্রী শেষে দু’-দু’টি স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সোহেল চৌধুরী ২০০৯ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শিপিং কোম্পানী ‘(ঘণক খরহব)' যোগদান করে দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখে বর্তমানে ‘চীফ অফিসার’ পদে কর্মরত এবং খুব শিগগির ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতির অপেক্ষাধীন।

শৈশব থেকে মেধাবী ছাত্র সোহেল চৌধুরী কোনোরূপ ঝামেলায় জড়িত না হওয়া পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনকারী ছেলেটি আজ মামলা চক্রের বেড়াজালে কেবল বাড়িছাড়াই নয়, গর্ভধারিনী মাকে নিয়ে ঘুরছেন রাস্তায় রাস্তায়। বিগত ২০১৬ সালের ১৬ জুন নিজ গ্রামের পার্শ্ববর্তী উত্তর মৌড়াইল মহল্লার বাসিন্দা মো. কামাল মিয়ার কন্যা আদ্দীনা সুলতানা মিথিলার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াটাই যেনো কাল হয়ে দাঁড়ায় সোহেল চৌধুরীর। তছনছ হয়ে যায় তার সবকিছু। কেইবা জানতো এই মিথিলা এতোটা বদচরিত্রের এবং ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত! মিথিলা ক্রমেই বিষিয়ে তুলে সোহেলের জীবন। স্ত্রীর বিরুদ্ধে শ্বশুরের কাছে নালিশ করায় প্রতিকার-শান্তনার বদলে উল্টো শ্বশুর কামাল মিয়ার রোষানলে পড়েন সোহেল চৌধুরী।

বিয়ের পর সোহেলের পরিবার জানতে পারেন, ইতিপূর্বে দক্ষিণ মৌড়াইল মহল্লার আরেক বাসিন্দা কমিন শাহ’র পুত্র জুম্মানের সাথে মিথিলার বিয়ে হয়ে ছিলো। বিয়ের পর মিথিলার শারিরিক-মানসিক নির্যাতন আর মাদক সেবনে অতিষ্ঠ হয়েই জুম্মান বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়। কামাল মিয়া তখন জুম্মানের বৃদ্ধ বাবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন লোককে বাদী করিয়ে ১২টি মামলা দিয়ে কয়েক বছর কারাবাসও করায়। এসব নানান ঘটনার প্রেক্ষিতে বিগত ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর সোহেল চৌধুরী তার স্ত্রী মিথিলাকে আইনানুগভাবে ডিভোর্স দিয়ে ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চীন গিয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। ছয়দিনের মাথায় মিথিলার বাবা কামাল মিয়া মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে সোহেল চৌধুরী, তার মা-মামা ও দুই খালাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেলের মামা ও এক খালা প্রায় দুই মাস কারাভোগও করেন।

মামলার আই.ও এসআই সুমন চন্দ্র চক্রবর্তী বাদী কামাল মিয়ার অজ্ঞাবহ হয়ে সোহেল চৌধুরীর পরিবারের উপর বিভিন্ন সময় অত্যাচার-নির্যাতন চালানোসহ মানসিক ভয়ভীতি দেখিয়ে তিন লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। বিগত ২০১৮ সালের ২০ জুলাই সোহেল সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আসার এক মাসের মাথায় চাকরিতে যোগদানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিামানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন থেকে গ্রেপ্তার হয়ে। পরবর্তীতে ১৫ দিনের মাথায় হাইকোর্ট থেকে জামিনপ্রাপ্ত হন।

কিন্তু কারাগারে জামিনের আদেশনামা পৌঁছানোর আগেই তার নামে যশোর থেকে একটি মানব পাচার মামলার (নং৩১/২০১৬) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসে। যার কাগজপত্র পরবর্তীতে ভুয়া প্রমাণিত হয়। কিন্তু এরই মাঝে আশুলিয়া থানার আরেকটি ভুয়া অভিযোগের মামলায় (নং ৫৬/৯/১৮) গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন জায়াগা থেকে মামলা আসতে দেখে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সোহেল ও তার পরিবার। এরই মাঝে কামাল মিয়া তারই অনুগত নয়নপুর গ্রামের মৃত গেদু মিয়ার পুত্র সাহেদ মিয়া, সেলিম মিয়া ও কর্ণেল আহমেদ নামের ব্যক্তিকে নিয়ে কেরানিগঞ্জ কারাগারে একটি বিশেষ কক্ষে সোহেলের সাথে সাক্ষাত করে।

এ সময় ৩০ টি মামলা দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মামলায় সাজা করিয়ে আজীবন কারাগারে রাখাসহ তার মাকে পঙ্গু করে ফেলার হুমকি দেন। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে তাদের কয়েকটি শর্ত মানার আল্টিমেটাম দেয়। সোহেল কারাভ্যন্তরের কয়েকজনের সাথে আলোচনায় বুঝতে পারে কামাল মিয়া তাকে রাজারবাগ পীরের মামলা চক্রে বিক্রী করে দিয়েছেন। এতে তিনি ফেঁসে গেছেন। উপায়ান্তর না দেখে কামাল মিয়ার শর্ত সোহেলের মা মেনে নিয়ে বাধ্য হয়ে নগদ এক লাখ টাকা এবং ৩৪ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন।

এছাড়া কামাল মিয়া সাদা কাগজে সোহেলের মা, দুই খালা ও মামার কাছ থেকে স্বাক্ষর রাখেন। দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগের পর গত ২৮ এপ্রিল সোহেল কেরানিগঞ্জ কারাগার থেকে বের হয়ে মিথিলাকে পুনরায় বিয়ে করে সংসার শুরুর কিছুদিন পরই সোহেলের দ্বিতল বাড়িটি মিথিলাকে লিখে দিতে কামাল মিয়া আবারও চাপ দিতে থাকেন। মিথিলাকে দিয়েও চালাতে থাকে অত্যাচার। এক পর্যায়ে মিথিলা সোহেলকে প্রাণনাশের চেষ্টা করাসহ নিজেও আত্মহত্যা করার হুমকি দেয়। বাড়ি লিখে না দেয়ায় গত ১৩ জুলাই সাদা পোষাকে এসআই সুমন চক্রবর্তী, সাহেদ, সেলিমসহ অজ্ঞাতনামা ১০/১২জন বাড়িতে গিয়ে সোহেলের মাকে মারধর করে। এসময় পুত্রবধু মিথিলা চাবি ছিনিয়ে নিয়ে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়, আসবাবপত্র লুটে নেয়াসহ বাড়িটি দখলে নিয়ে সোহেল ও তার মাকে মারধর শেষে কামাল মিয়ার বাসায় নিয়ে নজরবন্দী করে রাখে। দুই দিনের মধ্যে বাড়ি লিখে না দিলে মা-পুত্র দু’জনকেই মেরে রেললাইনে ফেলে দেবার হুমকি দেয়। পরদিন মিথিলার মা হঠাৎ অসুস্থ হবার সুবাধে সোহেল তার মাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে জানতে পারেন অপর বাড়িটিও ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে কামাল গংরা দখলে নিয়েছে। এরপরই প্রাণভয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়েন মা-পুত্র। কামাল মিয়া তার মেয়েকে দিয়ে ‘বিয়ে ব্যবসা’র মাধ্যমে মামলার চক্রে ফেলে দু’-দু’টি পরিবারকে করেছে সর্বশান্ত।

এ বিষয়ে কামাল মিয়া বলেন, তার জামাই সোহেল চৌধুরীর বাড়ীঘরে হামলা, ভাংচুর এবং তার বিরুদ্ধে মানব পাচার মামালার বিষয়ে যে অভিযোগ তা সত্য নয়। এছাড়া তার মেয়ের পূর্বের স্বামী হিরু জুম্মানের পিতা কমিন শাহ্ এর বিরুদ্ধে মানব পাচার সহ যে ১২টি মামলা হয়েছে এবিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। 

এব্যাপারে সদর থানার এসআই, সুমন চক্রবর্তীর বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়।

এবিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, মামলাবাজ সিন্ডিকেটের বেড়াজালে অনেক পরিবার নিঃস্ব। ভূতুরে এসব মামলার গেড়াকলে সারাদেশের শতাধিক মানুষ বছরের পর বছর  মিথ্যা মামলায় জেল খাটছে। এ চক্রটি কিভাবে মানুষের সম্পদ, অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দেশের শীর্ষ টিভি চ্যানেল এনটিভি নিউজ টীম দীর্ঘ দেড়বছরের অনুসন্ধান করে ৬য় পর্বের ধারাবাহিক সিরিজ রির্পোট প্রচার করে। এতে উঠে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নি:শ্ব দুটি পরিবারের করুন কাহিনী।

বাংলাপত্রিকা/আরিইউ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন