নাটোরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাতাবি লেবু

লিটন হোসেন লিমন, নাটোর প্রতিনিধি | বাংলা পত্রিকা স্পেশাল
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৯ | ০৫:৪৫:৫৯ পিএম
নাটোরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাতাবি লেবু
কাজী নজরুলের কাঠবিড়ালি বাতাবি লেবু খায় কিনা জানা নেই, তবে নাটোরের মানুষেরা ব্যাপকভাবে বাতাবি লেবু খাচ্ছেন। হাট-বাজারগুলোতে বাতাবি লেবুর ব্যাপক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি এর ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। উৎপাদন ও ব্যবহারের নিরিখে জেলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশীয় সহজলভ্য নিরাপদ এবং উপকারী এই ফলটি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে জেলায় বাতাবি লেবুর চাষাবাদ বেড়েছে। চলতি বছরে জেলায় মোট ১৮৬ হেক্টর জমিতে বাতাবি লেবু চাষ হয়েছে। এরমধ্যে নাটোর সদর উপজেলায় সর্বাধিক ৬০ হেক্টর, সিংড়া উপজেলায় ৩৬ হেক্টর, বাগাতিপাড়ায় ৩০ হেক্টর, গুরুদাসপুরে ২৫ হেক্টর, লালপুরে ২০ হেক্টর, নলডাঙ্গায় ১০ হেক্টর এবং বড়াইগ্রাম উপজেলায় ৫ হেক্টরে বাতাবি লেবুর চাষ হয়েছে। গত বছরে জেলায় আবাদকৃত জমির পরিসর ছিল ১৩১ হেক্টর এবং এর আগের বছরে ১০০ হেক্টর।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে এখন বাতাবি লেবুর বিপনন হতে দেখা যাচ্ছে। তবে নাটোর সদর, সিংড়া এবং বাগাতিপাড়া উপজেলাতে এর আধিক্য। জেলার প্রধানতম বাজার-নীচাবাজারে বিগত প্রায় এক মাস যাবৎ বাতাবি লেবু বিপনন হচ্ছে। বিগত বছরগুলোর চেয়ে এই বিপননের পরিধি ব্যাপক। প্রতিদিন অন্তত পঞ্চাশজন ব্যবসায়ী বাতাবি লেবু বিক্রি করছেন।

নিয়মিত বিক্রেতা শরৎ কুমার বললেন, নিজের গাছের ছাড়াও হাট থেকে কিনে এনে প্রতিদিন বাতাবি লেবু বিক্রি করি। এবছর ফলন ভালো হওয়ায় সরবরাহও অনেক বেশী।

একই কথা জানিয়ে সিংড়া উপজেলার হাতিয়ানদহ হাটের ফল ব্যবসায়ী ফজের আলী বলেন, শুধু খুচরা ক্রেতাই নয়, শহরের ফল বিক্রেতারা একসাথে অনেক লেবু পাইকারী কিনে নিয়ে যান। দাম দশ টাকা থেকে বিশ টাকা করে প্রতি পিস।

শহরের অভিজাত ফলের দোকানেও বাতাবি লেবু শোভা বর্ধন করছে। কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে ঝিলিক ফল ভান্ডারের পরিচালক সোহানুর রহমান জানান, উৎপাদকরা বাতাবি লেবু সরবরাহ করেন। বিক্রিও ভালো। সচেতন মানুষের ঝোঁক সম্পূর্ণ অর্গানিক এই ফলের প্রতি।

কলেজ শিক্ষক ও গৃহীনি মাসুমা সুলতানা বলেন, বাতাবি লেবু সম্পূর্ণ অর্গানিক। তাই এই মৌসুমে বাড়ীতে প্রতিদিন রীতিমত নিয়ম করে নিরাপদ ও সুস্বাদু এই দেশীয় ফল খাওয়া হচ্ছে। বাড়ীর সব সদস্যই বাতাবি লেবু পছন্দ করে। এমনকি অতিথি আপ্যায়নেও বাতাবি লেবু খেতে দেয়া হচ্ছে।

নিয়মিত বাতাবি লেবু খান এমন ব্যক্তিরা জানান, বাতাবি লেবু রক্ত পরিশোধন, ত্বক, খুশকী, এসিডিটি এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্যে খুবই উপকারী। বাতাবি লেবু ভিটামিন এ, সি, পাইরিডক্সিন, ফলিক এসিড, থায়ামিন, ফসফরাস, আয়রন ক্যালসিয়াম, কপার, বিভিন্ন ফাইটোনিউট্রিয়েন্স, লিমোনয়েড এর উৎস বলে হাড় মজবুত করে, বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে, রক্ত পরিষ্কার করে, অম্ল রোধ করে, কিডনীর পাথর হওয়া রোধ করে, মাড়ির রোগে উপকার করে, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে, ক্যান্সার জীবানু ধ্বংস করে, কোলেষ্টেরল হ্রাস করে, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে বলে জানিয়েছেন পুষ্টি অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা।

সাধারণত বসতবাড়ী কেন্দ্রিক বাতাবি লেবুর চাষ হয়ে আসছে। থাইল্যান্ডের উন্নত জাত আমদানী করতে পারলে বাণিজ্যিকভাবে বাতাবি লেবু উৎপাদন করে সফল হওয়া সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেন নাটোরের বিশিষ্ট ফল উৎপাদক আতিকুর রহমান আতিক।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের জাতীয় পরামর্শক দেশের খ্যাতনামা ফল বিজ্ঞানী এস এম কামরুজ্জামান বলেন, আগে এক সময় দেশে বর্ষা উত্তর বিভিন্ন অসুখের নিরাময়ে বাতাবি লেবুর অনন্য ভ‚মিকা ছিল। নিরাপদ এই ফলটি ঔষধী গুনে সমৃদ্ধ।

এস এম কামরুজ্জামান আরো বলেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও চায়নার কিছু উন্নত জাতের বাতাবি লেবু দেশে চাষ হচ্ছে। তবে ইসরাইলের একটি সীডলেস জাত এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ। এর এক একটির ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত এবং সুমিষ্ট এই লেবু খুবই সুস্বাদু। থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে খুব কষ্টে সংগ্রহ করা এই জাতের ফলনে সফলতা পেয়েছেন জানিয়ে এই ফল বিজ্ঞানী বলেন, বিশ্বে চাহিদা সম্পন্ন দামী এই জাতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাপত্রিকা/এসআর

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন