‘শীলং তীরে ভাগ্য ফিরেনি মড়াই মিয়ার’ ভাঙল সংসার!

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, সিলেট প্রতিনিধি | সারাদেশ
প্রকাশিত: বুধবার, ৯ অক্টোবর ২০১৯ | ০৫:১৯:২৬ পিএম
‘শীলং তীরে ভাগ্য ফিরেনি মড়াই মিয়ার’ ভাঙল সংসার!
দিনমজুর মড়াই মিয়া (ছদ্ম নাম)। পেশায় ভ্যানচালক। বয়স ৪০। ‘শীলং তীর’ নামক জুয়া খেলা নিয়মিত খেলেন তিনি। প্রতিদিন দুপুরের পর সিলেট নগরের ঘাসিটুলাস্থ তীরের বের্ডে খেলতে আসেন।

খেলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১০০ টাকায় সাত হাজার টাকা, ১০ টাকায় ৭০০ টাকা, ২০ টাকায় এক হাজার ৪০০ টাকা। এ লোভনীয় লাভের আশায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে প্রতিদিন জুয়ার আস্তানায় আসন গেড়ে বসেন তিনি। এ খেলায় টাকার পরিমাণ যত বৃদ্ধি পায় লাভ্যাংশটাও তত বৃদ্ধি পায়। তিনি জানান অর্ধ দিনে যে রোজগার করেন তার পুরোটাই বিলিয়ে দেন জুয়ার বোর্ড। বাজির এ খেলা খেলে তিনি এখন নিঃস্ব। স্ত্রী ঝিয়ের কাজ করে কোনমতে সংসার চালালেও সম্প্রতি তাকে (তালাক) দিয়ে ছেড়ে চলে গেছেন।

ওই অটোচালক জানান, তার মতো অনেকেই প্রতিদিন এখানে খেলতে আসেন। বাজির এই খেলায় কেউ জিতেন কেউবা আবার হারেন। ‘তীর’ নামক এই জুয়ায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। এতে কেউ হচ্ছেন লাখপতি, কেউ হচ্ছেন নিঃস্ব। আর তাদের প্রতারণার খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মাঝে মধ্যে জুয়াড়িদের ধরতে লোকদেখানো অভিযান চালালেও এ খেলা বন্ধ করতে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সচেতন মহলে। অভিযোগ উঠেছে, সিলেটের সবকটি থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কিছু কর্মকর্তারা তীর জুয়ার আয়োজকদের কাছ থেকে নিয়মিত বখরা নিয়ে থাকেন।
 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেটজুড়ে ‘শীলং তীর’ নামক জুয়া খেলা ছড়িয়ে পড়েছে। এ খেলা এখন বিস্তৃত নগরের অলিগলিতে। দিনমজুর থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এ খেলায় আসক্ত। জড়িয়ে পড়েছেন নারীরাও। দিনমজুররা দ্রুত লাভের আশায় আয় করা অর্থ বিলিয়ে দিচ্ছেন জুয়ার আসরে। স্বল্প পুঁজিতে, অল্প সময়ে জনসাধারণকে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন স্বার্থান্বেষী দালাল ও এজেন্টরা। জুয়ার এ বাণিজ্যে জড়িত আছেন ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় রাজনৈতিক নেতা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করেই সিলেটের ভিবিন্ন স্থানে ‘শীলং তীর’র নামে চলে জুয়া ও মাদকের আড্ডা। সেই সঙ্গে সারারাত ধরে চলে মাদক বেচাকেনার আড্ডা। সম্প্রতি নগরের কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, মদ, নগদ টাকা ও জুয়ার সরঞ্জামসহ জড়িত কয়েকজনকে আটক করেছে র্যাব-৯।

জুয়ার আসর (বোর্ড) বসার পেছনে সংশ্লিষ্ট মার্কেট কমিটির কতিপয় সদস্য, রাজনীতিবিদ, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও স্থানীয় দাপুটে নেতার জড়িত। জুয়াড়িরা তাদের মাশোহারা চাঁদা দিয়ে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ এ খেলা। তীর খেলাকে আকর্ষণীয় করতে যুক্ত হয়েছেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। নগরীর সুবিদবাজার, বাগবাড়ী, কাজলশাহ, কানিশাইল (খেয়া ঘাট), বেতের বাজার, লালাদিঘীড় পার, কুয়ার পাড়, শেখ ঘাট, টিকর পাড়া, ভাংগাটিকর (হাওর), কাজির বাজার, মোগল টুলা, ঘাসিটুলা, আম্বরখানা, মজুমদারি, ধুপাগুল, কাকুয়ার পাড়, নয়াবাজার, মিরাবাজার, যতর পুর, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, উপশহর, মেন্দিবাগ, কাজিটুলা, বন্দরবাজার, সুরমা মার্কেট, লামাবাজার, বিল পাড়, ভাতালিয়া, তালতলাসহ প্রতিটি পাড়ামহল্লায় বসে এ জুয়ার জমজমাট আসর। জুয়ার এ আসর চলে মধ্যেরাত পর্যন্ত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শীলং তীর নামক জুয়া প্রথমে শুরু হয় সিলেটের সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাটে। ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয় সিলেটের বিভিন্ন স্থানে। এ দেশের এজেন্টদের মাধ্যমে এক থেকে ৯৯ পর্যন্ত নাম্বার বিক্রয় করা হয়। যত মূল্যে বিক্রয় হয় তার ৭০ গুণ লাভ দেওয়া হয় বিজয়ী নাম্বার ক্রয়কারীকে। অর্থাৎ এক টাকায় ৭০ টাকা। একই নাম্বার একাধিক লোকও কিনতে পারেন। সবাই কেনা দামের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি টাকা পাবেন। সপ্তাহে ছয় দিন এ খেলাটি পরিচালিত হয়। ফলাফল ঘোষণা করা হয় প্রতিদিন বিকাল ৫টায়।

সিলেট নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার মো. জেদান আল মুসা বলেন, তীর খেলা বন্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। জুয়া ও মাদকের কোনো কারবার চালাতে দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যেই এসব অপকর্ম বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্টদের মেসেজ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ চালালে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

বাংলাপত্রিকা/এসএ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন